৪৪তম বিসিএস নন-ক্যাডার

জ্যেষ্ঠতা হারানোর শঙ্কায় পিএসসির সামনে প্রার্থীদের প্রতিবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ৭, ২০২৬, ০৪:০১ পিএম

দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর ৪৪তম বিসিএস নন-ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগের চূড়ান্ত ধাপে দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়েছেন প্রায় তিন হাজার চাকরিপ্রার্থী। ফলাফল প্রকাশের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও সুপারিশপ্রাপ্তদের দাপ্তরিক ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে না পাঠানোর প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছেন তারা। 

বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কার্যালয়ের সামনে এক বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন প্রার্থীরা।

আন্দোলনরত ২ হাজার ৯৬৮ জন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর দাবি, অবিলম্বে তাদের ফাইল পিএসসি থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করতে হবে। অন্যথায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যে অসম জ্যেষ্ঠতা বা ‘সিনিয়রটি’র সংকট তৈরি হচ্ছে, তার দায়ভার পিএসসিকেই নিতে হবে।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ৪৪তম বিসিএস নন-ক্যাডারের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়। পিএসসির প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ফলাফল প্রকাশের ১৫ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে সুপারিশপ্রাপ্তদের তথ্য বা দাপ্তরিক ফাইল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা। কিন্তু এবারের ক্ষেত্রে আড়াই মাস পার হয়ে গেলেও ফাইলগুলো এখনো পিএসসির গণ্ডি পেরোতে পারেনি।

প্রার্থীদের প্রধান উদ্বেগ জ্যেষ্ঠতা নিয়ে। তারা জানান, ৪৪তম বিসিএসের কাজ স্থবির হয়ে থাকলেও পরবর্তী অর্থাৎ ৪৫তম বিসিএসের কার্যক্রম দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। ইতিমধ্যে ৪৫তম বিসিএসের স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময়সূচী নির্ধারিত হয়েছে। যদি ৪৫তম বিসিএসের প্রার্থীরা আগে যোগদান করেন, তবে ৪৪তম বিসিএসের এই বিশাল সংখ্যক নন-ক্যাডার কর্মকর্তা পেশাগত জীবনে জ্যেষ্ঠতা হারাবেন। প্রশাসনিক কাঠামোর এই সম্ভাব্য বৈষম্য দূর করতেই তারা দ্রুত ফাইল পাঠানোর আল্টিমেটাম দিয়েছেন।

সকাল থেকেই পিএসসি ভবনের সামনে ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে জড়ো হতে থাকেন চাকরিপ্রার্থীরা। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, “আমরা মেধার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। কিন্তু দাপ্তরিক গাফিলতির কারণে আমাদের ক্যারিয়ার এখন হুমকির মুখে। দুই মাস সময় কোনোভাবেই একটি ফাইল পাঠানোর জন্য যৌক্তিক হতে পারে না।

আন্দোলনরত প্রার্থীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত মূল দাবিগুলো হলো:

১. অবিলম্বে ২ হাজার ৯৬৮ জন প্রার্থীর ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে।
২. মে মাসের মধ্যেই পুলিশ ভেরিফিকেশন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করতে হবে।
৩. ৪৫তম বিসিএসের যোগদানের আগে ৪৪তম বিসিএসের প্রার্থীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রার্থীদের এই আন্দোলনের মুখে পিএসসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মতিউর রহমান গণমাধ্যমকে বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, ফাইল পাঠাতে দেরি হওয়ার পেছনে কোনো অবহেলা নেই, বরং কিছু কারিগরি ও প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে।

মতিউর রহমান বলেন, নন-ক্যাডার পদে বিভিন্ন কারিগরি ও বিশেষায়িত পদ থাকে। এই পদগুলোর যোগ্যতা ও তথ্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে কিছুটা বাড়তি সময় লাগছে। পিএসসি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছে দেওয়া হবে।তবে কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ তিনি উল্লেখ করেননি।

নন-ক্যাডার সুপারিশপ্রাপ্তরা অভিযোগ করেন, ক্যাডার সার্ভিসের নিয়োগ প্রক্রিয়া যে গতিতে চলে, নন-ক্যাডারের ক্ষেত্রে পিএসসি সব সময়ই কিছুটা ধীরগতি অবলম্বন করে। একজন চাকরিপ্রার্থী আক্ষেপ করে বলেন, আমরা বিসিএস ক্যাডার না হয়েও প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। আমরাও মেধাবী এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের যোগ্য। অথচ আমাদের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিসিএস পরীক্ষায় দীর্ঘ কয়েক বছরের প্রক্রিয়া শেষে একজন প্রার্থী সুপারিশপ্রাপ্ত হন। ফলাফল পরবর্তী দাপ্তরিক দীর্ঘসূত্রতা প্রার্থীদের মাঝে মানসিক চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে ৪৫তম বিসিএসের কাজ এগিয়ে যাওয়া ৪৪তম বিসিএসের প্রার্থীদের জন্য একটি অসম লড়াইয়ের পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

মানববন্ধন শেষে প্রার্থীরা জানান, তারা আজ কেবল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে নিজেদের দাবি পিএসসি চেয়ারম্যানের নজরে আনতে চেয়েছেন। যদি চলতি সপ্তাহের মধ্যে ফাইল প্রেরণের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না দেখা যায়, তবে তারা আরও কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেবেন। প্রার্থীরা মে মাসের শেষ নাগাদ নিয়োগের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন যাতে তারা জুন বা জুলাইয়ের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করতে পারেন।

বিসিএস নন-ক্যাডার নিয়োগের এই জট দ্রুত নিরসন না হলে প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ডেও ভবিষ্যতে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষা ও নিয়োগ বিশেষজ্ঞরা। এখন দেখার বিষয়, পিএসসি তাদের কারিগরি যাচাই-বাছাই কতো দ্রুত শেষ করে সুপারিশপ্রাপ্তদের মুখে হাসি ফোটায়।

এএন