লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল রোডের পরিচিত দৃশ্য, কাসাব্লাঙ্কা ক্যাফের কাঁচের কাউন্টারের ওপাশে সাজানো রয়েছে গরম সিঙ্গাড়া আর বিরিয়ানি। দুপুরের ভিড়ে ক্যাফেটি গমগম করছে। তবে এ সাধারণ আড্ডার ভেতরেই এখন বইছে উত্তাল রাজনৈতিক হাওয়া।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর এই প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্যের মাটিতে বসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এ সুযোগ কি সত্যিই দেশের ক্ষমতার পটপরিবর্তনে কোনো বড় ভূমিকা রাখবে?
লন্ডনের পূর্ব প্রান্তে বসবাসরত কয়েক লক্ষ বাংলাদেশির মধ্যে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে যেমন উত্তেজনা আছে, তেমনি আছে এক ধরনের উদাসীনতা ও প্রশাসনিক জটিলতার ক্ষোভ। আল জাজিরার এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ প্রবাসীদের ভোটের অধিকার পাওয়ার আনন্দ এবং সেই অধিকার প্রয়োগের পথে থাকা নানা বাধার গল্প।
বিগত কয়েক বছর ধরেই প্রবাসীরা দাবি জানিয়ে আসছিলেন যে, তারা দেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠালেও তাদের কোনো রাজনৈতিক মূল্যায়ন হয় না। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সেই দাবি পূরণ করেছে।
বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৭০ লক্ষ ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। এটি মোট ১২ কোটি ৭০ লক্ষ ভোটারের প্রায় ৫ শতাংশ। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে ৬ লক্ষ ৪৫ হাজার বাংলাদেশি বা ব্রিটিশ বাংলাদেশি বাস করলেও মাত্র ৩২ হাজার জন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন।
নিবন্ধনের এ স্বল্প সংখ্যার পেছনে বেশ কিছু বাস্তব কারণ খুঁজে পেয়েছেন বিশ্লেষকরা। ভোট দিতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি থাকা বাধ্যতামূলক। অনেক ব্রিটিশ বাংলাদেশি, বিশেষ করে দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট বা এনআইডি নেই।
আবার এনআইডি কার্ড করা, বায়োমেট্রিক দেওয়া এবং অ্যাপের মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালটের আবেদন করা, অনেক বয়স্ক প্রবাসীর জন্য এ পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল বলে মনে হয়েছে। এ ছাড়া লন্ডনে এমন অনেক বাংলাদেশি আছেন যাদের বৈধ ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস নেই। তারা ভোট দিতে ইচ্ছুক হলেও সরকারের নজরে আসার ভয়ে দূরত্ব বজায় রাখছেন।
লন্ডন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অন্যতম কেন্দ্র। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান ১৭ বছর নির্বাসন কাটিয়ে সম্প্রতি দেশে ফিরলেও তার দীর্ঘ প্রবাস জীবনের কারণে লন্ডনের সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেউ তাকে পরিবর্তনের প্রতীক মনে করেন, আবার কেউ মনে করেন সাধারণ কর্মজীবী প্রবাসীদের সাথে তার যোগাযোগ ছিল খুবই কম।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার ভাগ্নি ও ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক সম্প্রতি বাংলাদেশে একটি দুর্নীতির মামলায় অনুপস্থিতিতে কারাদণ্ড পাওয়ায় লন্ডনের রাজনীতিতেও শোরগোল পড়েছে। তার সমর্থকরা একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বললেও বিরোধীরা একে বিচারের অংশ হিসেবে দেখছেন।
হোয়াইটচ্যাপেল মার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা তরুণ প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই এ নির্বাচন নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। ২৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী রেদওয়ান আহমেদ বলেন, আমি এ ভোট বয়কট করেছি। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখায় এই ভোটের বৈধতা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। অনেকের মতে, তারা লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, তাই বাংলাদেশের রাজনীতি তাদের প্রাত্যহিক জীবনে সরাসরি কোনো প্রভাব ফেলে না।
নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, কিছু কিছু আসনে প্রবাসী ভোটারের সংখ্যা মোট ভোটারের প্রায় ২০ শতাংশ। যদি কোনো আসনে লড়াই খুব হাড্ডাহাড্ডি হয়, তবে প্রবাসীদের এ পোস্টাল ব্যালট চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে গেম চেঞ্জার হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে সিলেট ও নোয়াখালীর মতো অঞ্চলগুলোতে প্রবাসীদের ভোটের প্রভাব অনস্বীকার্য।
কাসাব্লাঙ্কা ক্যাফেতে বসে ব্যারিস্টার খালেদ নূর বলেন, লোকেরা পরিবর্তনের কথা বলছে, কিন্তু তারা এখনো সন্দিহান যে ভোট সত্যিই সুষ্ঠু হবে কি না। তবে ৫৮ বছর বয়সী জাহানারা বেগমের মতো অনেকেই আশাবাদী।
তিনি বলেন, আমি ১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম ভোট দিলাম। আমি চাই আমার দেশ শান্তিতে থাকুক এবং আমার সন্তানরা সেখানে নিরাপদ থাকুক। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং প্রবাসীদের এ গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সক্ষমতাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাবে।
ইএইচ