বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের রাজধানী দিল্লির একটি গোপন আশ্রয়স্থল থেকে এনডিটিভিকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তার ক্ষমতাচ্যুতি ছিল গণতন্ত্রের নির্মম বিপর্যয়।
তিনি অভিযোগ করেন, মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশকে কর্তৃত্ববাদ, উগ্রবাদ ও সংখ্যালঘু নিপীড়নের দিকে ঠেলে দিয়েছে। দেশত্যাগের পর এটিই ছিল তার সবচেয়ে বিস্তৃত ও খোলামেলা সাক্ষাৎকার।
শেখ হাসিনার ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত ছাত্র আন্দোলনকে ‘বিকৃত’ করে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, এগুলো ছিল পরিকল্পিত। কয়েকটি অগণতান্ত্রিক শক্তি পরিস্থিতিকে এমনভাবে ঘোলাটে করল যে নিরাপত্তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ল। তাতে আমার পরিবার ও সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে উঠেছিল। দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্ত।
তিনি মনে করেন, তার সরকার দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়েছিল, যা পরবর্তীতে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস’ করা হয়েছে।
তবে তিনি আশা করেন বাংলাদেশের মানুষ নতুন করে গণতান্ত্রিক পথ খুঁজে নেবে।
শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবন ৩২ ধানমন্ডি ভাঙচুরের ঘটনায় তার কণ্ঠে ছিল তীব্র ক্ষোভ। তিনি বলেন, এটি বর্বরোচিত। যারা এটি করেছে, তারা স্বাধীনতার ইতিহাস মুছে ফেলতে চেয়েছে।
তার মতে, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহ্য কেবল স্থাপনা নয় এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার প্রতীক, যা জনগণের হৃদয়ে অম্লান।
দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার 'অবৈধ' যা নির্বাচনকে বারবার পিছিয়ে দিচ্ছে শুধু জনরায়ের ভয়েই।
তার দাবি, ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচনের ঘোষণা এসেছে, সেটিও 'নাটক ছাড়া কিছু নয়' কারণ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে লক্ষ লক্ষ সমর্থককে অযথা ভোটাধিকারহীন করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি মনে করেন, 'একটি অসাংবিধানিক চার্টার'ও নানা ধরনের সংস্কার সবই ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার কৌশল।
শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, দেশজুড়ে হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ ব্যাপক ও পরিকল্পিত মন্দির ভাঙচুর, বাড়িঘর লুট, মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা সবই চলমান।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র শুধু ব্যর্থ নয় এগুলো অস্বীকার করে উল্টো হামলাকারীদেরই উসকে দেওয়া হয়েছে।
তার দাবি, তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে উগ্রবাদকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর ছিলেন। কিন্তু ইউনুস নাকি উগ্রপন্থীদের মন্ত্রিসভায় জায়গা দিয়েছেন এবং সন্ত্রাসী সংগঠন-সম্পর্কিত ব্যক্তিদের মুক্তি দিয়েছেন, যা দেশের ধর্মীয় সহনশীলতাকে বিপন্ন করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা ওয়াশিংটন এই পালাবদলে ভূমিকা রেখেছে।
তবে শেখ হাসিনা এনডিটিভিকে বলেন, তিনি এ বিষয়ে 'সুস্পষ্ট প্রমাণ' পাননি। বরং তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ইউনুসকে ভুলভাবে আদর্শ নেতা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। এখন তারা বুঝতে পারছেন, তার সিদ্ধান্তগুলো কতটা অস্থিতিশীল ও উগ্রবাদপন্থী।
ভারত তাকে আশ্রয় দেওয়ায় কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নয় চার হাজার কিলোমিটার সীমান্ত, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক বন্ধন আছে। তার ভাষায়, ভারত আমাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে সম্মান করে। বাংলাদেশকে নিজের শক্তিতে এগোতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ছিল ‘সবার বন্ধু’। অর্থনৈতিক কূটনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি সম্পর্ক গড়েছিলেন। তার মতে, ইউনুসের কূটনীতি 'অনিশ্চিত, প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বল্পমেয়াদি' যা পশ্চিমা দেশগুলোর সাথেও বিরূপ সম্পর্ক তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা ভুল নয়, কিন্তু তা হতে হবে সতর্ক ও পরিমিত। তার অভিযোগ ইউনুস সরকার জঙ্গিবাদ-সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে, যা আবারও বাংলাদেশকে উগ্রপন্থীদের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত করতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি
ইএইচ