ভূস্বর্গ খ্যাত কাশ্মীরের আকাশে এখন বিষণ্ণতার ছায়া। হিমালয়ের পাদদেশের এই উপত্যকাটি বর্তমানে কেবল একটি বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডই নয়, বরং এটি ভারতীয় রাজনীতিতে ‘হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের’ এক পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ—বিশেষ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি এবং মুসলিম শিক্ষার্থীদের মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দেওয়া—ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কাশ্মীরের স্বতন্ত্র পরিচয়কে মুছে ফেলে তাকে একটি বৃহত্তর সাম্প্রদায়িক কাঠামোর ভেতরে বিলীন করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে।
কাশ্মীরের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হলো এর মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলো। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরু থেকেই জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ এই পবিত্র স্থানগুলোর ওপর এক নজিরবিহীন নজরদারি শুরু করেছে। ইমাম ও ধর্মশিক্ষকদের ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং এমনকি আর্থিক লেনদেনের খুঁটিনাটি তথ্য সম্বলিত দীর্ঘ ফরম পূরণ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ একে ‘সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল’ হিসেবে দাবি করলেও স্থানীয় জনগণের কাছে এটি স্পষ্টতই একটি ‘অনধিকারমূলক অভিযান’। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, উপাসনালয়কে সন্দেহের তালিকায় ফেলে পুরো একটি সম্প্রদায়কে মানসিকভাবে কোণঠাসা করার এটি একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল।
কাশ্মীরের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা হলো জম্মুর শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল এক্সেলেন্স বন্ধ করে দেওয়া। মেধার ভিত্তিতে জাতীয় ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এই কলেজে ভর্তি হওয়া প্রথম ব্যাচের ৫০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪২ জনই ছিলেন মুসলিম।
ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর দাবি ছিল, হিন্দু তীর্থস্থানের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে মুসলিমদের পড়ার অধিকার নেই। এর জের ধরে পরিকাঠামো সংকটের অজুহাত দেখিয়ে কলেজটির স্বীকৃতি বাতিল করে জাতীয় মেডিকেল কমিশন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, বর্তমানে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় মেধার চেয়ে ধর্মীয় পরিচয় বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাওয়াদ খালিদের মতে, কাশ্মীরে যা ঘটছে তা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি গত এক দশকে ভারতের মূল ভূখণ্ডে চলতে থাকা মুসলমানদের প্রান্তিকীকরণের রাজনীতির একটি সম্প্রসারিত রূপ। লাভ জিহাদ, ল্যান্ড জিহাদ কিংবা গরু রক্ষার নামে গণপিটুনির মতো বিতর্কিত বিষয়গুলো এখন কাশ্মীরের সামাজিক কাঠামোতেও প্রবেশ করছে।
বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে যেভাবে বুলডোজার সংস্কৃতি বা সমষ্টিগত শাস্তির প্রবণতা দেখা যায়, কাশ্মীরে তার রূপ আরও কঠোর। এখানে তল্লাশি অভিযান, বিচারহীন আটক এবং সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়ন এখন প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ কিছু তথ্য:
সাম্প্রদায়িক সহিংসতা: ২০২৪ সালে ভারতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বেড়েছে প্রায় ৮৪ শতাংশ, যার বড় অংশই ঘটেছে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে।
ঘৃণা ভাষণ (Hate Speech): ২০২৫ সালে ১ হাজার ৩০০টিরও বেশি ঘৃণামূলক বক্তব্যের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
গণগ্রেপ্তার: ২০২৫ সালের এপ্রিলে পেহেলগাম হামলার পর প্রায় ২ হাজার ৮০০ জনকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাংবাদিক ও সমাজকর্মী ছিলেন।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা জম্মু ও কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া, বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং উপত্যকার বাইরে থাকা কাশ্মীরি শিক্ষার্থীদের হয়রানিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কাশ্মীর এখন সারা ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রবণতার একটি আয়না বা প্রতিচ্ছবি। একদিকে হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করছে, অন্যদিকে মানুষের মুক্ত চিন্তার অধিকার হরণ করছে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন কি সম্ভব?
বিশ্লেষকদের মতে, সিদ্ধান্ত এখন ভারতের সাধারণ জনগণের হাতে। তারা কি গান্ধী-নেহরুর সেই ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করবে, নাকি সাভারকারের কল্পিত ঘৃণা ও বিভাজনের পথে হাঁটবে? বর্তমান যে রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে খুব একটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে না।
কাশ্মীর আজ শুধু রাজনৈতিক বিরোধের ক্ষেত্র নয়, বরং এটি মানবাধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার এক বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র। হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের এই আগ্রাসন যদি না থামানো যায়, তবে উপত্যকাটি কেবল মানচিত্রের একটি অংশ হয়ে থাকবে, হারাবে তার যুগান্তরের ঐতিহ্যবাহী সহাবস্থানের চেতনা।
এএন