বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী মার্কিন ধনকুবের ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের মৃত্যুর সাত বছর হতে চলল। কিন্তু তার রেখে যাওয়া বিশাল অর্থবিত্তের উত্তরাধিকার নিয়ে আইনি লড়াই ও রহস্য যেন কাটছেই না। সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ এপস্টিন-সংক্রান্ত প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠার এক বিশাল নথি জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে।
এই নথিতে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—মৃত্যুর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে এক গোপন দলিলে সই করে এপস্টিন তার সম্পদের সিংহভাগ লিখে দিয়ে গেছেন তার শেষ প্রেমিকা কারিনা শুলিয়াকের নামে।
এপস্টিনের জন্মসালের স্মরণে তৈরি করা হয়েছিল ‘১৯৫৩ ট্রাস্ট’ নামের একটি বিশেষ দলিল। ৩২ পৃষ্ঠার এই গোপন নথিটি সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসার পর দেখা যায়, ২০১৯ সালে কারাগারে আত্মহত্যার মাত্র দুই দিন আগে এপস্টিন তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বিলিবন্দোবস্ত চূড়ান্ত করেছিলেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, তিনি বেলারুশীয় বংশোদ্ভূত প্রেমিকা কারিনা শুলিয়াককে বিয়ে করার কথা গুরুত্বের সাথে ভাবছেন। এই দলিলের মাধ্যমেই শুলিয়াক এপস্টিন সাম্রাজ্যের প্রধান সুবিধাভোগী বা ‘বেনিফিশিয়ারি’ হয়ে ওঠেন।
এপস্টিনের ট্রাস্টে শুলিয়াক ছাড়াও আরও প্রায় ৪০ জনের নাম রয়েছে। তবে প্রধান তিন অংশীদার হলেন কারিনা শুলিয়াক (প্রেমিকা)। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ১০ কোটি ডলার সমমূল্যের অর্থ পেতে যাচ্ছেন। এর মধ্যে তার সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য রাখা হয়েছে ৫ কোটি ডলারের একটি স্থায়ী বার্ষিক বৃত্তি।
ড্যারেন ইনডাইক (ব্যক্তিগত আইনজীবী) ট্রাস্ট থেকে তার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ কোটি ডলার। রিচার্ড কান (ব্যক্তিগত হিসাবরক্ষক) এপস্টিনের অর্থব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা এই ব্যক্তি পেতে পারেন ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
২০১৯ সালে এপস্টিনের মৃত্যুর সময় তার সম্পদের আনুমানিক মূল্য ছিল প্রায় ৬০ কোটি ডলার। কিন্তু ২০২৬ সালের আদালতের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই সম্পদের বর্তমান অর্থমূল্য নাটকীয়ভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২ কোটি ডলারে।
সম্পদ হ্রাসের প্রধান কারণগুলো হলো এপস্টিনের হাতে নির্যাতিত নারীদের বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদান, দীর্ঘ সাত বছরের জটিল আইনি লড়াই ও আইনজীবীদের উচ্চ ফি, মার্কিন সরকারের কর এবং অন্যান্য দেনা পরিশোধ ও এপস্টিনের অধিকাংশ বিলাসবহুল দ্বীপ ও আবাসিক সম্পত্তি এরই মধ্যে বিক্রি হয়ে যাওয়া।
নথি অনুযায়ী, বেলারুশের নাগরিক শুলিয়াক ২০১২ সাল থেকে এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে ছিলেন। এপস্টিনই তার ডেন্টাল স্কুলে পড়াশোনার যাবতীয় খরচ বহন করতেন। বর্তমানে ৩৬ বছর বয়সী শুলিয়াক নিউইয়র্ক শহরে বসবাস করছেন। মার্কিন বিচার বিভাগের নথিতে তাকে এপস্টিনের শেষ দিনগুলোর ছায়াসঙ্গী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এপস্টিনের সম্পত্তির প্রধান আইনজীবী ড্যানিয়েল ওয়েইনার স্পষ্ট জানিয়েছেন, ট্রাস্টে নাম থাকা কেউই এখনই কোনো অর্থ হাতে পাবেন না।
তার আগে মেটাতে হবে তিনটি বড় দায়। এপস্টিনের শিকারে পরিণত হওয়া নারীদের ক্ষতিপূরণের চূড়ান্ত দাবি। বিভিন্ন ঋণদাতা ও সংস্থার পাওনা। সম্পত্তির ওপর ঝুলে থাকা সরকারি দাবি বা কর।
৪০ জনের সেই সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের তালিকায় আরও রয়েছেন এপস্টিনের সাবেক সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েল (যিনি বর্তমানে সাজা খাটছেন), তার ভাই মার্ক এপস্টিন এবং মার্টিন নোওয়াকের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।
উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে এপস্টিন নথির প্রকাশ বিশ্বজুড়ে অনেক রাঘববোয়ালকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। তবে বর্তমান এই নতুন নথিতে কেবল সম্পদের উত্তরাধিকারই নয়, বরং এপস্টিনের অন্ধকার জগতের শেষ দিনগুলোর এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।
এএন