সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ক্ষোভ, বৈশ্বিক শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা ট্রাম্পের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬, ১১:২৮ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈশ্বিক আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট তার আগের শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি নতুন করে শুল্ক বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত জানান। বিষয়টি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে নতুন করে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয় সময় শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোস্যাল–এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, আগে কখনও ব্যবহার করা হয়নি এমন একটি আইনের অধীনে তিনি সব দেশের পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করবেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং এটি “অবিলম্বে কার্যকর” হবে।

এর আগে শুক্রবার তিনি আদালতের রায়ে বাতিল হওয়া শুল্কের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত সব পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে নতুন ঘোষণায় সেই হার ১৫ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলেন। যদিও এই বাড়তি ৫ শতাংশ শুল্ক কবে থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি।

স্থানীয় সময় শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে। প্রধান বিচারপতি জন রোবার্টসের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ৬-৩ ভোটে এই রায় দেন। আদালত রায়ে উল্লেখ করে, প্রেসিডেন্টের ব্যবহৃত আইনি ভিত্তি সংবিধানসম্মত নয় এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের বিস্তৃত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ।

এই রায়ের ফলে পূর্বে আরোপিত শুল্ক কার্যত বাতিল হয়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। তবে সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আদালতের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প নতুন আইনি পথ খুঁজে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন।

ট্রাম্প তার পোস্টে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে “অযৌক্তিক, দুর্বলভাবে লেখা এবং অত্যন্ত আমেরিকাবিরোধী” বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, যদি এই রায় বহাল থাকে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেবে এবং দেশীয় শিল্পকে মারাত্মক ক্ষতির মুখে ফেলবে।

আরও এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, আপিল আদালতের অবস্থান পক্ষপাতদুষ্ট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার ভাষায়, “এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে, তা সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেবে।” আদালতের বিরুদ্ধে এমন সরাসরি মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনের কাছে আনুমানিক ১৩৩ বিলিয়ন ডলার ফেরত চাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আদালতের রায়ে পূর্ববর্তী শুল্ক অবৈধ ঘোষিত হওয়ায় আমদানিকারকরা অর্থ ফেরতের দাবি তুলেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল অঙ্কের অর্থ ফেরত দিতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের কোষাগারের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে চলমান বাণিজ্য সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের নতুন করে শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, আগে কখনও প্রয়োগ করা হয়নি এমন একটি আইনের আওতায় তিনি শুল্ক বাড়াচ্ছেন। যদিও তিনি আইনের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি, তবে প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে জাতীয় নিরাপত্তা বা জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা সংক্রান্ত একটি বিধান ব্যবহার করা হতে পারে।

সমালোচকদের মতে, কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন এই সিদ্ধান্তও আবার আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

আগামী মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এখন যদি তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়, তবে আমদানিকারক ও খুচরা বিক্রেতাদের খরচ আরও বাড়বে। এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়েও পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুল্ক বৃদ্ধির ফলে আমদানি নির্ভর শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে প্রতিফলিত হবে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। অন্যদিকে, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে শুল্ক আরোপ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলো পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবতে পারে। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশ জানিয়েছে, যদি অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হয়, তবে তারা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় অভিযোগ দাখিলসহ পাল্টা শুল্ক আরোপের পথ বিবেচনা করবে।

বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, অটোমোবাইল, ভোক্তা পণ্য ও কৃষিপণ্যের বাজারে এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে।

ট্রাম্প বরাবরই “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির পক্ষে সোচ্চার। তার মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং শুল্ক আরোপের মাধ্যমে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। তবে বিরোধীরা বলছেন, অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরপরই শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে একটি শক্ত অবস্থান প্রদর্শনের কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রশাসন আদালতের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজেদের নীতি এগিয়ে নিতে বিকল্প আইনি পথ খুঁজছে।

সব মিলিয়ে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর যে স্বস্তির ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল, ট্রাম্পের নতুন ঘোষণায় তা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। ১০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে শুল্ক বৃদ্ধির পরিকল্পনা কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।

এখন নজর থাকবে প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে কখন এবং কীভাবে নতুন শুল্ক কার্যকর করে, কংগ্রেস বা আদালত আবারও এতে হস্তক্ষেপ করে কি না, এবং আন্তর্জাতিক বাজার কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতিগত সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ।

এএন