২০২৬ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহেই পাল্টে গেল বাংলাদেশের চিরচেনা ফিলিং স্টেশনগুলোর দৃশ্যপট। মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ঘনীভূত হওয়া কালো ধোঁয়া এবার আঘাত হেনেছে দেশের পাম্পগুলোতে।
জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় টান পড়ার আশঙ্কায় দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র আতঙ্ক। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং তেলের প্যানিক বায়িং বা অতিরিক্ত মজুত রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
শুক্রবার বিকেলে এক জরুরি নির্দেশনায় সংস্থাটি প্রতিটি যানবাহনের জন্য জ্বালানি তেল সংগ্রহের দৈনিক সীমা বা কোটা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
বিপিসির নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী এখন থেকে চাইলেই কেউ ট্যাংক ভর্তি করে তেল নিতে পারবেন না। যানবাহনের ধরন ভেদে নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি বণ্টন করা হবে। মোটরসাইকেলের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন, ব্যক্তিগত গাড়ি বা কারের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ ১০ লিটার, জিপ বা এসইউভি ও মাইক্রোবাসের জন্য দৈনিক ২০ থেকে ২৫ লিটার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া লোকাল বাস ও পিকআপের জন্য দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল বরাদ্দ করা হয়েছে। এই কঠোর রেশনিং ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো সীমিত মজুত দিয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে সেবা দেওয়া এবং কেউ যেন অতিরিক্ত তেল কিনে ঘরে বা ড্রামে মজুত করতে না পারে তা নিশ্চিত করা।
বিপিসি কেবল তেলের পরিমাণই বেঁধে দেয়নি, তেল বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াটিতে স্বচ্ছতা আনতে নতুন নিয়ম জারি করেছে। এখন থেকে ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নেওয়ার পর গ্রাহককে অবশ্যই একটি অফিশিয়াল রসিদ সংগ্রহ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে তেল নিতে এলে আগের সেই রসিদটি পাম্প কর্তৃপক্ষকে দেখাতে হবে।
অর্থাৎ এক দিনেই একাধিক পাম্প ঘুরে কোটার অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ডিলারদের ক্ষেত্রেও নিয়ম কড়াকড়ি করা হয়েছে। এখন থেকে কোনো পাম্প মালিককে তাদের নিয়মিত বরাদ্দের অতিরিক্ত এক ফোঁটা তেলও সরবরাহ করা হবে না। প্রতিটি ডিপো থেকে তেল ছাড়ের আগে সেই পাম্পের বর্তমান মজুত ও বিক্রির তথ্য যাচাই করা হবে।
শুক্রবার ছুটির দিনেও রাজধানীর সড়কগুলোতে ছিল দীর্ঘ যানজট, তবে তা চলাচলের জন্য নয় বরং তেলের জন্য। পরিবাগ, শাহবাগ, শেরাটন মোড় থেকে শুরু করে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল পর্যন্ত দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মেজাজ হারাচ্ছেন চালকরা। শাহবাগ এলাকায় তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা উবার চালক সেলিম চৌধুরীর কণ্ঠে ঝরছিল ক্ষোভ।
তিনি বলেন, প্রায় এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র কয়েক লিটার তেল পেলাম। এই সময়ে কয়েকটা ট্রিপ দিতে পারতাম। আমাদের মতো দিনমজুরদের যদি তেল নিয়ে এভাবে বসে থাকতে হয় তবে না খেয়ে মরতে হবে। অনেক জায়গায় লাইনের সিরিয়াল নিয়ে চালকদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতির খবর পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি ছিল চোখে পড়ার মতো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অনেক জায়গায় পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মতে বাংলাদেশ তার চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি বিদেশ থেকে আমদানি করে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ এই সরবরাহ ব্যবস্থাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে।
বিশেষ করে ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ চেইনকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। যদিও বাংলাদেশে তেলের জাহাজ আসার সূচি নির্ধারিত রয়েছে কিন্তু যুদ্ধের কারণে সেই সময়সূচিতে বড় ধরণের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিপিসি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় বারবার আশ্বস্ত করছে যে দেশে বর্তমানে তেলের কোনো শূন্যতা নেই।
পর্যাপ্ত বাফার স্টক গড়ে তোলার জন্য রেল ওয়াগন ও ট্যাংকারের মাধ্যমে ডিপোগুলোতে তেল পাঠানো হচ্ছে। সরকার বলছে আতঙ্কিত হয়ে মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহ করায় কৃত্রিম সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নেতিবাচক সংবাদ এই আতঙ্ককে আরও উসকে দিচ্ছে।
জ্বালানি সচিব এক বার্তায় জানিয়েছেন যে তেলের মজুত আছে তবে আমাদের সাশ্রয়ী হতে হবে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল আনা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। এই রেশনিং ব্যবস্থা সাময়িক এবং সরবরাহ স্বাভাবিক হলেই এই বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হবে। সরকার ইতিমধ্যে ১১ দফা সাশ্রয়ী নির্দেশনা জারি করেছে।
এসি ২৫ ডিগ্রির ওপরে রাখা, আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা এবং ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিপিসির এই রেশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্তত এপ্রিল মাস পর্যন্ত তেলের সরবরাহ সচল রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রাস্তায় তেলের দীর্ঘ লাইন কেবল একটি জ্বালানি সংকটের চিত্র নয়, এটি বৈশ্বিক ভূ রাজনীতির প্রভাবে একটি উন্নয়নশীল দেশের লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের পর্যটন ক্ষতি থেকে শুরু করে পাম্পে ২ লিটার তেলের জন্য হাহাকার সবই একই সুতোয় গাঁথা। সাধারণ মানুষের জন্য এখন একটাই পরামর্শ আতঙ্কিত না হয়ে সাশ্রয়ী হওয়া এবং পরবর্তী সরকারি নির্দেশনার জন্য ধৈর্য ধরা।
জেএইচআর