তেহরান ও নয়াদিল্লি ইরানের ইতিহাসের এক চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তেহরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস দেশের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণা করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর, তার মেজ ছেলে ৫৬ বছর বয়সী মোজতাবা খামেনিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের তৃতীয় সুপ্রিম লিডার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে।
৮৮ জন সিনিয়র আলেমের সমন্বয়ে গঠিত এই পর্ষদ গত রাতে এক বিবৃতিতে মোজতাবার ওপর এই গুরুভার অর্পণের বিষয়টি নিশ্চিত করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিপূর্বে মোজতাবার এই মনোনয়নকে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করলেও, তেহরানের কঠোর মনোভাবের সামনে তা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
মোজতাবা খামেনি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইরানের রাজনীতির মূল মঞ্চের আড়ালে থেকে ছায়ার মতো কাজ করেছেন। ১৯৬৯ সালে ইরানের মাশহাদ শহরে জন্ম নেওয়া মোজতাবা আলী খামেনির ছয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়।
তার পরিচয় নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সবসময়ই এক ধরণের রহস্য ছিল। তাকে প্রায়ই তার পিতার গেটকিপার বা দ্বাররক্ষক এবং পাওয়ার ব্রোকার হিসেবে অভিহিত করা হতো। কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি পদে না থেকেও তিনি ছিলেন ইরানের নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি।
মোজতাবার রাজনৈতিক পথচলায় বড় একটি তর্কের জায়গা ছিল তার ধর্মীয় পদমর্যাদা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার জন্য আয়াতুল্লাহ পদবি থাকা আবশ্যক হলেও মোজতাবার পদমর্যাদা ছিল হুজ্জাতুল ইসলাম। তবে পর্ষদের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তাকে সরাসরি আয়াতুল্লাহ হিসেবে অভিহিত করার মধ্য দিয়ে সেই বিতর্কের অবসান ঘটানো হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে মোজতাবা ইরান ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের সেই দিনগুলোতেই ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের আইআরজিসি শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তার গভীর সখ্য গড়ে ওঠে। এই ঘনিষ্ঠতাই আজ তাকে ক্ষমতার চূড়ায় বসাতে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
মোজতাবা খামেনির ব্যক্তিগত জীবন এবং তার বিশাল অর্থবিত্ত নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা মুখরোচক তথ্য প্রচারিত রয়েছে। ব্লুমবার্গের রিপোর্ট অনুযায়ী, মোজতাবা যুক্তরাজ্যে ১৩৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের অট্টালিকা, দুবাইয়ে বিলাসবহুল ভিলা এবং ইউরোপজুড়ে বেশ কিছু অভিজাত হোটেলের মালিক।
এছাড়াও সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে তার বেনামী অ্যাকাউন্ট এবং পারস্য উপসাগরে বিশাল শিপিং ব্যবসা রয়েছে বলে জানা যায়। ২০০৪ সালে তিনি রক্ষণশীল নেতা গোলাম আলী হাদ্দাদ আদেলের কন্যা জোহরা হাদ্দাদ আদেলকে বিয়ে করেন। সাম্প্রতিক তেহরান হামলায় জোহরা প্রাণ হারিয়েছেন, যা মোজতাবার জন্য এক ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি।
২০১৯ সালে তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন মোজতাবার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ ছিল, মোজতাবা কোনো আনুষ্ঠানিক পদে না থেকেও তার পিতার হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা তৈরি এবং ইরানে দমনমূলক নীতি বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
মোজতাবার রাজনৈতিক আদর্শ পুরোপুরি সংস্কারবিরোধী এবং পশ্চিমা বিরোধী। ২০০৫ ও ২০০৯ সালে হার্ডলাইনার মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় আনতে এবং সংস্কারবাদী আন্দোলন দমনে মোজতাবার ভূমিকা ছিল প্রশ্নাতীত। এমনকি ২০২২ সালে পুলিশি হেফাজতে মাহসা আমিনি হত্যার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সময়ও মোজতাবা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছিলেন বিপ্লবী প্রজন্মের প্রতিনিধি, যিনি নানা পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতেন। কিন্তু মোজতাবা খামেনিকে দেখা হচ্ছে পুরোপুরি সিকিউরিটি এস্টাবলিশমেন্ট বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফসল হিসেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মোজতাবার শাসনামলে ইরানের রাজনীতিতে আইআরজিসি বা বিপ্লবী গার্ড কোরের প্রভাব অনেকগুণ বেড়ে যাবে। তিনি একজন ধর্মতাত্ত্বিক নেতার চেয়ে একজন সামরিক ও নিরাপত্তা ভিত্তিক একনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমন এবং আন্তর্জাতিক চাপ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি মোজতাবাকে এখন তার পিতার অসমাপ্ত প্রতিশোধ নেওয়ার চ্যালেঞ্জটিও মোকাবিলা করতে হবে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতাবা খামেনির অভিষেক কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ রাজনৈতিক মোড় বদলে দেওয়ার এক সংকেত। ট্রাম্পের বিরোধিতার মুখেও মোজতাবার এই আরোহণ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিল।
পৃথিবী এখন তাকিয়ে আছে তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, মোজতাবার নেতৃত্বে ইরান কি সমঝোতার পথে আসবে, নাকি প্রতিশোধের আগুনে বিশ্বকে পুড়িয়ে মারবে?
জেএইচআর