ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আর যুদ্ধের মেঘে ঢাকা মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে দীর্ঘ স্থবিরতার পর অবশেষে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়লেও, আজ ১০ মার্চ থেকে সৌদি আরব, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বেশ কিছু গন্তব্যে পুনরায় বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। যদিও ভিসা প্রাপ্তিতে জটিলতা এবং টিকেট মূল্যের ঊর্ধ্বগতি যাত্রীদের ভোগান্তিতে রাখছে, তবুও ভারতসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পর্যটন ও প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব ও ওমানের মতো গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যগুলোতে পূর্ব নির্ধারিত ফ্লাইটের প্রায় ৪০ শতাংশ পুনরায় চালু হয়েছে। এয়ার ইন্ডিয়া, ইন্ডিগো, এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের পাশাপাশি সৌদিয়া, ওমান এয়ার, এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ এবং স্পাইসজেট পুনরায় তাদের ফ্লাইট সিডিউল সাজাচ্ছে।
বিশেষ করে ভারতের কেরালা রাজ্যের বিমানবন্দরগুলো কোচি, তিরুবনন্তপুরম এবং কোঝিকোড় এখন মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সংযোগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। রিয়াদ, জেদ্দা, মাস্কাট, দুবাই এবং দোহার মতো শহরগুলোর সাথে সরাসরি এবং বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো।
কেরালার অর্থনীতিতে পর্যটন এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের গুরুত্ব অপরিসীম। আকাশপথ বন্ধ থাকায় এই খাতে যে ধস নেমেছিল, তা কাটিয়ে উঠতে কেরালা এখন অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ওমান ও সৌদি আরব থেকে আসা বিশেষ ফ্লাইটগুলো পর্যটকদের পাশাপাশি ঘরে ফিরতে ইচ্ছুক প্রবাসীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফ্লাইট চালু হলেও ট্রানজিট ভিসা পেতে বিলম্ব হওয়ার কারণে অনেক যাত্রী এখনো বিমানবন্দরে আটকা পড়ে আছেন। বিশেষ করে যারা তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে চাইছেন, তাদের জন্য এই ভিসা জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক দেশের আকাশপথ এখনো পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়নি, যার ফলে বিমানগুলোকে দীর্ঘ পথ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে।
ফ্লাইট সংখ্যা কমে যাওয়া এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে টিকেটের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। কেরালা থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর টিকেটের দাম গত কয়েক দিনের তুলনায় অনেক বেশি। এয়ারলাইনসগুলো পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে টিকেটের তারিখ পরিবর্তন বা বাতিলের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয় নীতি গ্রহণ করেছে, তবে উচ্চমূল্য সাধারণ যাত্রীদের বাজেটে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
যুদ্ধের দামামার মধ্যেও ওমান নিজেকে একটি শান্তিপূর্ণ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। দেশটির মনোরম সমুদ্র সৈকত এবং প্রাচীন দুর্গগুলো পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে। অন্যদিকে, সৌদি আরবের পর্যটন খাত এবং পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালনের জন্য দেশটিতে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা ধর্মপ্রাণ মানুষদের জন্য এই আংশিক বিমান চলাচল বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
এভিয়েশন খাতের এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া পুরোপুরি নির্ভর করছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আকাশপথ সম্পূর্ণ খুলে দেওয়ার ওপর। বিমানবন্দরের স্লট প্রাপ্তি এবং রেগুলেটরি বডির অনুমোদনের ওপর ভিত্তি করে আগামী কয়েক সপ্তাহে ফ্লাইটের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এপ্রিলের মাঝামাঝি নাগাদ যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয়, তবে গ্রীষ্মকালীন পর্যটন মৌসুমে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে বিশ্ব পর্যটন শিল্প।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বিশ্ব ভ্রমণে যে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, তার মধ্যে এই আংশিক বিমান চলাচল একটি বড় বিজয়। তবে পূর্ণাঙ্গ স্থিতিশীলতার জন্য বিশ্ববাসীর নজর এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে।
এএন