ধ্বংসস্তূপের নিচে শৈশব

ইরানে যৌথ হামলায় ৬ মাসের শিশুসহ নিথর একটি পরিবার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ১৪, ২০২৬, ০৪:১৬ পিএম

যুদ্ধের ময়দানে যখন রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ আর ভেতরের অনুভূতির গল্প চলে, তখন নিভৃত কোনো আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায় নিরপরাধ প্রাণ। আজ শনিবার ভোরের সূর্য ওঠার আগেই ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় ইলাম প্রদেশের আইভান শহর এক নারকীয় অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ বিমান হামলায় একটি সাধারণ আবাসিক ভবন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে, যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন একই পরিবারের ছয়জন সদস্য। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সদস্যটির বয়স ছিল মাত্র ছয় মাস।

আল জাজিরা ও স্থানীয় ইরানি সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, আইভান শহরে কোনো সামরিক স্থাপনা নয়, বরং একটি বেসামরিক আবাসিক এলাকা লক্ষ্য করে এই মারণাস্ত্র ছোড়া হয়। উদ্ধারকর্মীরা যখন ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছিলেন, তখন একটি ধুলোবালিমাখা নিথর দেহের সারি বেরিয়ে আসে। ৬ মাসের সেই দুগ্ধপোষ্য শিশুটি হয়তো জানতও না তার দেশের আকাশে কী যুদ্ধ চলছে। এই নিছক মানবিক বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে ইরানজুড়ে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্ধার অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে, কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেকে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসের অলিন্দে যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে চলছে এক রহস্যময় ও অস্পষ্ট বিতর্ক। গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, এই ধ্বংসাত্মক সংঘাতের শেষ কোথায়? ট্রাম্পের উত্তর ছিল তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে, যখন আমি এটি আমার ভেতর থেকে অনুভব করব। 

এই মন্তব্যের পর মার্কিন রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। কেবল নিউজ নেটওয়ার্ক বা সিএনএন এর নিউজনাইট প্যানেলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি দেশের সামরিক নীতি যখন কৌশলগত লক্ষ্যের চেয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তা বিশ্ব শান্তির জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ট্রাম্পের এই ভেতরের অনুভব কি আরও হাজারো শিশুর প্রাণ নেবে, নাকি কূটনীতির কোনো পথ খুলবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না।

এদিকে, আঞ্চলিক যুদ্ধের বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। আজ শনিবার এক বিবৃতিতে তারা ইরানকে আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার দিলেও একটি বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে। 

হামাস বলেছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের উচিত প্রতিবেশীদের লক্ষ্যবস্তু না করা। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আসা সংগঠনটি মনে করছে, সংঘাত যদি প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ছড়িয়ে পড়ে, তবে পুরো অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তারা তেহরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে সাধারণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো বিপাকে না পড়ে।

সংঘাতের তীব্রতা যে কমছে না, তার প্রমাণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ২,৫০০ জন অতিরিক্ত স্থলসেনা পাঠিয়েছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশেষায়িত উভচর যুদ্ধজাহাজ, যা সমুদ্র ও স্থলে সমানভাবে কার্যকর। অন্যদিকে, ইরানের নতুন নেতা মোজতবা খামেনিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু করেছে। তাঁকে ধরিয়ে দিতে বা তাঁর অবস্থান জানাতে কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

খারগ দ্বীপের তেলের টার্মিনাল থেকে শুরু করে আইভান শহরের সাধারণ ঘরবাড়ি, আজ কিছুই নিরাপদ নয়। একদিকে ট্রাম্পের অনুভবের অপেক্ষা, অন্যদিকে নিথর পড়ে থাকা সেই ৬ মাসের শিশুর লাশ। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ এখন কেবল মানচিত্র দখলের লড়াই নয়, এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে মানবিকতার এক চরম পরাজয়। বিশ্ববিবেক এখন তাকিয়ে আছে এক অনিশ্চিত সমাপ্তির দিকে, যার চাবিকাঠি হয়তো কোনো সুনির্দিষ্ট নীতির চেয়ে একজনের খামখেয়ালি অনুভূতির ওপর বেশি ঝুলে আছে।

জেএইচআর