মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদ আর মিসাইলের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ১৫ দফার কঠোর শান্তি প্রস্তাব, অন্যদিকে ইরানের একের পর এক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সব মিলিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব। গত ২৪ থেকে ২৫ মার্চের ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কূটনীতি আর যুদ্ধ এখন সমান্তরালভাবে চলছে। ট্রাম্প দাবি করছেন ইরান চুক্তিতে আগ্রহী, কিন্তু তেহরানের মাঠ পর্যায়ের পদক্ষেপ বলছে ভিন্ন কথা।
২৫ মার্চ ওয়াশিংটনে রিপাবলিকান পার্টির এক অনুষ্ঠানে ডোনাল্ড ট্রাম্প এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেন। তিনি বলেন, ইরান আমাদের সাথে চুক্তি করতে মরিয়া হয়ে আছে, কিন্তু তারা প্রকাশ্যে এটি বলতে ভয় পাচ্ছে। কারণ তারা মনে করছে নিজেদের লোকের হাতেই তারা নিহত হতে পারে। ট্রাম্পের মতে, তাঁর শাসনামলে ইরান যে ধরনের চাপের মুখে পড়েছে, তা আগে কখনো দেখেনি। হোয়াইট হাউস সূত্র জানিয়েছে, পাকিস্তান বা অন্য কোনো বন্ধু দেশে একটি মধ্যস্থতা বৈঠকের চেষ্টা চলছে, যেখানে ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।
ট্রাম্প যখন আলোচনার কথা বলছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই ইসরায়েল ও মার্কিন স্থাপনাগুলোতে বৃষ্টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করছে ইরান। ২৫ মার্চ ভোরে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল আছড়ে পড়ে, যাতে অন্তত ১২ জন আহত হয়। এর আগের দিন ২৪ মার্চ ১০ ঘণ্টারও কম সময়ে ৭ দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তেহরান। বিশেষ করে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে এবং পারমাণবিক স্থাপনা সংলগ্ন শহরগুলোতে হামলা চালিয়ে ইরান তাদের সক্ষমতার জানান দিয়েছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, তারা শব্দের চেয়ে ১৩ গুণ বেশি দ্রুতগতির হাইপারসোনিক মিসাইল ব্যবহার করেছে, যা প্রতিহত করা প্রায় অসম্ভব। শুধু ইসরায়েল নয়, মধ্যপ্রাচ্য ছাপিয়ে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত ব্রিটিশ মার্কিন ঘাঁটিতেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইরানে এ পর্যন্ত ৯ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ৮১ হাজারেরও বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ২৪ মার্চ ইরানের তাবরিজ শহরে আবাসিক এলাকায় মার্কিন ইসরায়েলি হামলায় শিশুসহ ৬ জন নিহত হয়। এছাড়া ২৪৩ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিহতের খবর আন্তর্জাতিক মহলে শোকের ছায়া ফেলেছে। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে যে, তাদের হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সক্ষমতা প্রায় ৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যদিও বাস্তব চিত্র ভিন্ন কিছু বলছে।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। ইরান হুমকি দিয়েছে যে, তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র বা তেলের স্থাপনায় হামলা হলে তারা পুরো অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করে দেবে। এমনকি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তেহরান। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। ফিলিপাইনে ইতিমধ্যে জ্বালানি বিপর্যয়ের শঙ্কায় জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতে আসার পথে থাকা গ্যাসের ট্যাংকারগুলো হরমুজ প্রণালিতে আটকে আছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
যুদ্ধ বন্ধে পর্দার আড়ালে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। পাকিস্তান, তুরস্ক এবং মিসর বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান প্রদান করছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানকে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে তাদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সাথে ফোনালাপে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও এই সংঘাত নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে।
গত কয়েক দিনে ইরান বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি এবং বাসিজ ফোর্স প্রধান সোলাইমানি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে তেহরান। এছাড়া গোয়েন্দা মন্ত্রী খতিব ও বিপ্লবী গার্ডের মুখপাত্র জেনারেল নায়িনিও হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। তেহরান অভিযোগ করেছে যে, তাদের ভেতরে মোসাদের বড় ধরনের নেটওয়ার্ক কাজ করছে, যার ফলে গোপন তথ্য পাচারের অভিযোগে ইতোমধ্যে ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে যে ১৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, তার মধ্যে প্রধান শর্ত হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করা এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা না দেওয়া। বিনিময়ে ইরানকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রির সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে ইরান যুদ্ধ বন্ধের জন্য ৫টি কঠিন শর্ত দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ করা।
ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে আরও ৩ হাজার অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা নির্দেশ করে যে যুদ্ধ এখনই থামছে না। ট্রাম্প যদিও বলছেন তিনি জয়লাভ করেছেন, কিন্তু গত ২৪ ঘণ্টায় ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর ২৩টি হামলা এবং কুয়েত বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিরোধী মনোভাব চরমে। পোপ লিও থেকে শুরু করে বিশ্বনেতারা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। তবে যে হারে হামলা পাল্টা হামলা চলছে, তাতে জুনের মধ্যে এই অঞ্চলে সাড়ে ৪ কোটি মানুষ চরম খাদ্য ও জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত এখন আর কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি একটি বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিয়েছে। ট্রাম্পের শান্তি চুক্তি না কি ইরানের প্রতিরোধ, কোনটি জয়ী হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই মরণপণ লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের রক্তই বেশি ঝরছে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন, রয়টার্স ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা।
জেএইচআর