মধ্যপ্রাচ্য রণাঙ্গনে মার্কিন জয়ধ্বনি

ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধুলোয় মেশানোর দাবি সেন্টকমের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ২৬, ২০২৬, ১১:১৭ এএম
সেন্টকমের কমান্ডার ব্রাড কুপারফাইল। ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে। দীর্ঘদিনের বৈরী দুই পক্ষ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, এখন মুখোমুখি এক ভয়াবহ প্রক্সি এবং সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত। এই যুদ্ধের ময়দান থেকে আসা সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ইরানের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার দাবি করেছে মার্কিন বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম। বিশেষ করে ইরানের নৌ-শক্তি এবং ড্রোন প্রযুক্তির ওপর মার্কিন হামলায় অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্রাড কুপার বুধবার এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় গত তিন সপ্তাহের যুদ্ধের একটি খতিয়ান তুলে ধরেন। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন পুরোপুরি মার্কিন নিয়ন্ত্রণে এবং ইরানের সামরিক অবকাঠামোর একটি বিশাল অংশ এখন ধ্বংসস্তূপ।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে ব্রাড কুপার যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন, তা এক কথায় নজিরবিহীন। গত ২১ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা এই অভিযানে মার্কিন বিমানবাহিনী এবং নৌবাহিনী ইরানের অভ্যন্তরীণ ও কৌশলগত অবস্থানগুলোতে মুহুর্মুহু হামলা চালিয়েছে।

১০ হাজার লক্ষ্যবস্তু: কুপারের দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইরানের ১০ হাজারের বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে রয়েছে ভূগর্ভস্থ মিসাইল সাইলো, কমান্ড সেন্টার এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকারী রাডার স্টেশন।

আকাশে একাধিপত্য: এই সময়ে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের আকাশসীমায় বা তার আশেপাশে ১০ হাজার বারের বেশি সর্টি বা উড্ডয়ন সম্পন্ন করেছে। এর ফলে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

নৌবাহিনীর বিপর্যয়: সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি এসেছে ইরানের নৌ-শক্তি নিয়ে। ব্রাড কুপার দাবি করেছেন, ইরানের নৌবাহিনীর প্রধান বা বড় জাহাজগুলোর প্রায় ৯২ শতাংশই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে ইরানের যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তা এখন খাদের কিনারে।

ইরানের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো তাদের ড্রোন এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত, সবখানেই ইরানের তৈরি ড্রোনের কার্যকারিতা প্রমাণিত। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই উৎপাদন ব্যবস্থার মূলে আঘাত হেনেছে।

সেন্টকম কমান্ডারের ভাষ্যমতে, আমরা ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ক্ষমতা ৯০ শতাংশের বেশি কমিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি। এছাড়া তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির কারখানা এবং শিপইয়ার্ডগুলোর তিন ভাগের দুই ভাগ বা প্রায় ৬৬ শতাংশের বেশি হয় পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে, নয়তো এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেখান থেকে পুনরায় উৎপাদন শুরু করা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।

এই দাবি যদি সত্য হয়, তবে এটি হবে আধুনিক সামরিক ইতিহাসে ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা। কারণ, তাদের সামরিক কৌশলের মূল ভিত্তিই ছিল সস্তা ও কার্যকর ড্রোনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ব্যতিব্যস্ত রাখা।

ব্রাড কুপার স্পষ্ট করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানের একটি নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্য রয়েছে। আর তা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানের একটি নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্য রয়েছে। আর তা হলো ইরানের সীমান্তের বাইরে তাদের শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা অর্থবহ উপায়ে কমিয়ে দেওয়া। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর কাছে অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ বন্ধ করা এবং সরাসরি ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে অন্য দেশে আক্রমণ করার সক্ষমতা নষ্ট করাই ওয়াশিংটনের মূল পরিকল্পনা।

কুপারের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র তাদের লক্ষ্য অর্জনে কেবল সফলই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের চেয়েও এগিয়ে রয়েছে। তিনি মনে করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা চাইলেও কোনো বড় ধরনের প্রচলিত যুদ্ধে টিকতে পারবে না।

মার্কিন বাহিনীর এতসব সাফল্যের দাবির মাঝেও মুদ্রার উল্টো পিঠ কিন্তু অন্য কথা বলছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন এবং মাঠ পর্যায়ের তথ্যানুযায়ী, ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনো পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়নি।

এত বিপুল ক্ষয়ক্ষতির দাবি সত্ত্বেও, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে তেহরান এখনো নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই পাল্টা হামলায় বেশ কিছু অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং হতাহতের ঘটনাও নথিবদ্ধ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় বাণিজ্যিক বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে হামলার ফলে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম নিয়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে।

মার্কিন কমান্ডার ব্রাড কুপারের এই দাবিগুলো যদি শতভাগ নির্ভুল হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক বা আঞ্চলিক প্রভাবের অবসান ঘটতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান একটি বিস্তীর্ণ দেশ এবং তাদের সামরিক স্থাপনাগুলোর অনেকগুলোই অত্যন্ত গোপন এবং পাহাড়ে ঘেরা ভূগর্ভস্থ বাংকারে অবস্থিত। ফলে ৯২ শতাংশ নৌ জাহাজ বা ৯০ শতাংশ উৎপাদন ক্ষমতা ধ্বংসের দাবি কতটুকু বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞই সন্দিহান।

যাই হোক না কেন, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে যেমন প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক মার্কিন সমরাস্ত্রের শক্তি দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের গেরিলা কায়দায় ড্রোন ও মিসাইল ছোঁড়ার জেদ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। ব্রাড কুপারের ভিডিও বার্তাটি মূলত ইরানকে একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে ফেলার কৌশল হিসেবেও দেখছেন অনেকে। এখন দেখার বিষয়, তেহরান এই দাবির বিপরীতে কোনো ভিডিও প্রমাণ বা পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয় কি না।

জেএইচআর