মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক আধিপত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ‘আকাশপথের আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’ (AWACS) এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অতিমূল্যবান ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ (E-3 Sentry) রাডার বিমান ধ্বংস হয়েছে।
এই ঘটনার পর পেন্টাগন ও সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁদের মতে, এই একটি বিমান ধ্বংস হওয়ার ফলে দূর পাল্লার ইরানি হুমকি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখন এক বিশাল ‘নজরদারি ব্ল্যাকহোল’ বা অন্ধত্বের শিকার হতে যাচ্ছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন (CNN) কর্তৃক যাচাইকৃত স্যাটেলাইট ও ড্রোন চিত্রে দেখা গেছে, বিমানটির লেজ পুরোপুরি ভেঙে গেছে এবং এর ওপর থাকা সিগনেচার গোলাকার রাডারটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে।
১১ মার্চ সৌদি আরবের ওই ঘাঁটিতে চালানো ইরানি হামলায় এটি সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত হয়। যদিও এই হামলায় কোনো মার্কিন সেনা নিহত হয়নি, তবে অন্তত ১০ জন সেনাসদস্য আহত হয়েছেন এবং কয়েকশ কোটি ডলারের এই কৌশলগত সম্পদটি চিরতরে অকেজো হয়ে গেছে।
মার্কিন বিমানবাহিনীর কাছে বর্তমানে মাত্র ১৭টি এই ধরনের রাডার বিমান রয়েছে। একটি মাত্র ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ বিমান আকাশ থেকে একযোগে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে নজরদারি চালাতে পারে। এটি কেবল শত্রু বিমান শনাক্ত করে না, বরং যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন ফাইটার জেটের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ এবং ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের হাত থেকে সেগুলোকে রক্ষা করার প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করে।
সিএনএনের সামরিক বিশ্লেষক ও সাবেক মার্কিন কর্নেল সেড্রিক লেইটন এই বিপর্যয়কে ‘মারাত্মক আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এই রাডার বিমানটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের নজরদারি সক্ষমতার প্রাণকেন্দ্র। এটি ধ্বংস হওয়ায় মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোর সুরক্ষা এবং আকাশপথে শত্রুকে মোকাবিলা করার সক্ষমতা কয়েক দশক পিছিয়ে যেতে পারে।
মার্চ মাসের শুরু থেকেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী যুদ্ধের বর্তমান চিত্র বর্ণনা করা হলো।
ইরান ও হিজবুল্লাহর একযোগে চালানো হামলায় ইসরায়েলের ১০০টি শহরে সাইরেন বেজে উঠেছে। দেশটির শিল্পাঞ্চল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। তেল আবিবের তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪,৮২৯ জন ইসরায়েলি আহত হয়েছেন।
তেহরান ও ইস্পাহানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইরানে নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যে ২,০৭৬ ছাড়িয়ে গেছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনার জেরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ট্রাম্প ইরানের তেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘোষণা দিলে বাজার আরও অস্থির হয়ে ওঠে।
শান্তিরক্ষীদের মৃত্যু: লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী ঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলায় শান্তিরক্ষীরা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান যুদ্ধ অন্তত জুন মাস পর্যন্ত গড়িয়ে যেতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তিনি ইতিমধ্যে ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে বোমা ফেলেছেন এবং আরও কয়েক হাজার লক্ষ্যবস্তু বাকি রয়েছে। তবে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে সৈন্য সংকট এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েই চলেছে। ইসরায়েলি সেনাপ্রধান সতর্ক করেছেন যে, অতিরিক্ত চাপে বাহিনী ‘ভেঙে পড়ার’ ঝুঁকিতে রয়েছে।
এত সংঘাতের মাঝেও কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে পাকিস্তান। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসাতে মধ্যস্থতা করছেন। ট্রাম্পও জানিয়েছেন যে পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে আলোচনা সফলভাবে এগোচ্ছে। তবে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে আলোচনার কথা বললেও গোপনে তারা ইরানে বড় ধরনের স্থল অভিযানের নীল নকশা তৈরি করছে।
সৌদি আরবের মাটিতে মার্কিন রাডার বিমান ধ্বংস হওয়া কেবল একটি হার্ডওয়্যারের ক্ষতি নয়, এটি পেন্টাগনের ইগো এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ‘অজেয়’ ভাবমূর্তিতে এক বড় কুঠারাঘাত। এই নজরদারি সংকট চলাকালীন যদি ইরান পুনরায় বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তবে তা শনাক্ত বা প্রতিহত করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন আক্ষরিক অর্থেই এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
এএন