সারা বিশ্ব আজ এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের রেশ কাটেনি, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে দুমড়েমুচড়ে দিচ্ছে।
প্রতিটি দেশে জ্বালানি তেলের হাহাকার শুরু হয়েছে, মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী, আর সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। প্রশ্ন উঠেছে এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের শেষ কোথায়? শেষ পর্যন্ত জয়ের মালা কার গলায় উঠবে, আর এই রক্তক্ষয়ী অধ্যায় বন্ধের পথই বা কী?
মধ্যপ্রাচ্য হলো বিশ্বের ‘জ্বালানি ভাণ্ডার’। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সরাসরি সংঘাতের ফলে হরমোজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো আজ প্রায় অবরুদ্ধ। এর ফলে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ প্রতিটি উন্নয়নশীল দেশের পরিবহন ও খাদ্যপণ্যের ওপর। ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল, তারা এখন বিকল্প খুঁজছে, কিন্তু তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই।
যুদ্ধের ময়দানে 'জয়' শব্দটা আপেক্ষিক। আধুনিক সমরাস্ত্র ও ভূ-রাজনীতির বিচারে তিন পক্ষের অবস্থান বিশ্লেষণ করা যাক:
ইসরায়েল: অস্তিত্বের লড়াই
ইসরায়েলের মূল শক্তি তাদের উন্নত প্রযুক্তি এবং 'আয়রণ ডোম' ও 'অ্যারো'র মতো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তাদের লক্ষ্য ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে (হিজবুল্লাহ, হামাস) নির্মূল করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা। তবে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ ইসরায়েলের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ জনমতকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
ইরান সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর চেয়ে তাদের 'প্রক্সি' বা সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ক্লান্ত করে তোলার কৌশল নিয়েছে। ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি ও দূরপাল্লার মিসাইল মধ্যপ্রাচ্যে তাদের এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করেছে। তাদের জয় মানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন প্রভাব হটিয়ে দেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও ইসরায়েলকে অস্ত্র ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে। তবে ঘরের মাঠে আসন্ন নির্বাচন এবং ইউক্রেন যুদ্ধে বিশাল খরচের পর মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ বাইডেন বা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় বোঝা। যুক্তরাষ্ট্রের জয় নির্ভর করছে তারা কতটা কৌশলে ইসরায়েলকে রক্ষা করে আরব দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারে তার ওপর।
বিশেষজ্ঞ মতে এই যুদ্ধে প্রকৃত অর্থে কেউ 'জয়ী' হবে না। ধ্বংস হবে অবকাঠামো, আর প্রাণ যাবে সাধারণ মানুষের। যদি ইরানকে পুরোপুরি কোণঠাসা করা হয়, তবে তারা তেলের সরবরাহ বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয় নামিয়ে আনবে, যা সবার জন্যই পরাজয়।
বন্দুক বা মিসাইল দিয়ে এই যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কূটনীতিই একমাত্র পথ। ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী সমাধান ছাড়া ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা কমানো অসম্ভব। ইরানকে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তেহরানের সাথে নতুন করে পরমাণু চুক্তি বা নিরাপত্তা সংলাপ শুরু করা জরুরি। লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে হবে।
বিশ্ব এখন একটি 'মাল্টিপোলার' বা বহুমুখী শক্তির বিশ্বে পরিণত হয়েছে। এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এখন আর কোনো যুদ্ধ থামানো সম্ভব নয়। যদি চীন, রাশিয়া এবং আরব দেশগুলো একযোগে কাজ না করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিতে পারে।
সাধারণ মানুষ চায় শান্তি, কারণ তেলের ড্রামের আগুন এখন তাদের রান্নাঘরেও পৌঁছে গেছে। এখন দেখার বিষয়, বিশ্বনেতারা কি নিজেদের দম্ভ ত্যাগ করে মানবতার জন্য হাত মেলাবেন, নাকি ক্ষমতার লোভে পুরো পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবেন?।
এএন