সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইরানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে বেশ কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। বিবিসির পার্সিয়ান বিভাগের সিনিয়র রিপোর্টার ঘোঞ্চেহ হাবিবিয়াজাদের মতে, এই প্রতিনিধি দলের গঠন এবং তাদের গতিবিধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তেহরান হয়তো একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি সিরিয়াস। তবে এই আন্তরিকতার পেছনে রয়েছে চরম অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা।
এই প্রতিনিধি দলে এমন কিছু মুখ রয়েছেন যারা ইরানের রাজনীতি ও কূটনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী।
প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে রয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ। বর্তমানে তিনি ইরান সরকারের অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সম্প্রতি এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চরম অবিশ্বাস প্রকাশ করলেও কিছু অসমর্থিত সূত্র বলছে যে, যুদ্ধের সময় মার্কিন প্রশাসন তাঁকে একজন সম্ভাব্য অংশীদার বা ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে বিবেচনা করেছিল।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই দলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তিনি মূলত পারমাণবিক আলোচনার অভিজ্ঞ কারিগর। দীর্ঘদিনের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে দরকষাকষিতে তাঁর ভূমিকা অপরিসীম। উল্লেখ্য যে, যুদ্ধ শুরুর মাত্র দুই দিন আগেও আলোচনার একটি দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোল নাসের হেমমাতির উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, এই আলোচনার মূল ফোকাস হচ্ছে অর্থনীতি। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তাদের প্রধান দাবি হলো সমস্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।
বর্তমানে ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা যুদ্ধপূর্ব সময়ের চেয়েও অনেক বেশি শোচনীয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত শিল্পগুলো এখন ধ্বংসের মুখে।
ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের প্রধান শিল্প যেমন, ইস্পাত এবং পেট্রোকেমিক্যাল খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে উৎপাদন ক্ষমতা কমেছে এবং জাতীয় আয়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। এছাড়া গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে রেখেছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ মানুষের যোগাযোগের পাশাপাশি অনলাইন-ভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে এমনিতেই পঙ্গু করে দিয়েছিল, এখন নতুন করে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সেই সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
যদিও প্রতিনিধি দল আলোচনার টেবিলে বসেছে, তবে পরিস্থিতির জটিলতা কম নয়। একদিকে ঘালিবাফ প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করছেন, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে তাঁকে নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের এক ধরণের আগ্রহ কাজ করছে। এই দ্বিচারিতা ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নাকি কোনো সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক কৌশল, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা না হলে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক স্বস্তি না মিললে দেশটিতে বড় ধরণের সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
ইরানের এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঠানো একটি পরিষ্কার সংকেত যে, তারা যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং অর্থনৈতিক দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে চায়। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ এবং ইন্টারনেট বিভ্রাট দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। আরাগচি বা ঘালিবাফরা কি পারবেন টেবিলের আলোচনায় বসে সাধারণ ইরানিদের জন্য সুদিন ফিরিয়ে আনতে? নাকি অবিশ্বাসের দেয়াল আরও মজবুত হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা।
জেএইচআর