লেবাননের সাথে ‘দীর্ঘস্থায়ী’ শান্তি চুক্তির ঘোষণা নেতানিয়াহুর: ইসরায়েলের দুই কঠিন শর্ত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০২৬, ০৭:৩৯ এএম

ইসলামাবাদে যখন ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা মধ্যরাত অবধি গড়িয়েছে, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অন্যতম প্রধান চরিত্র ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একটি চাঞ্চল্যকর ঘোষণা দিয়েছেন। লেবাননের সাথে সরাসরি শান্তি আলোচনায় বসার ব্যাপারে নিজের সম্মতির কথা জানিয়েছেন তিনি। 

তবে এই শান্তির পথে তিনি এমন দুটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন, যা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন করে জটিল করে তুলতে পারে। নিচে নেতানিয়াহুর এই ঘোষণা এবং লেবানন ও ইসরায়েল শান্তি প্রক্রিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

শনিবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু নিশ্চিত করেন যে, তিনি লেবাননের সাথে সরাসরি সংলাপে বসার অনুমোদন দিয়েছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, গত এক মাসে লেবানন সরকার বেশ কয়েকবার ইসরায়েলের সাথে সরাসরি আলোচনা শুরু করার জন্য যোগাযোগ করেছে। 

নেতানিয়াহুর এই অবস্থানকে বিশ্লেষকরা যুদ্ধের ময়দানে ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। তিনি ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন যে, ক্রমাগত সামরিক চাপের কারণেই বৈরুত এখন আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য হচ্ছে।

শান্তি আলোচনায় রাজি হলেও নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যেকোনো সাধারণ সমঝোতা ইসরায়েলের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপি-র অনুবাদ অনুযায়ী, তিনি দুটি প্রধান শর্ত আরোপ করেছেন। প্রথমত, হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ। নেতানিয়াহুর প্রধান শর্ত হলো লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সমস্ত অস্ত্রশস্ত্রের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি বা নিরস্ত্রীকরণ। 

ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের অভিযোগ যে, হিজবুল্লাহ ইরানের মদদে তাদের উত্তর সীমান্তে বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই হিজবুল্লাহর অস্ত্র মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো শান্তি স্থায়ী হবে না বলে তিনি মনে করেন। দ্বিতীয়ত, প্রজন্মব্যাপী স্থায়ী চুক্তি। তিনি এমন একটি আসল শান্তি চুক্তি চান যা কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি হবে না, বরং আগামী কয়েক প্রজন্মের জন্য দুই দেশের মধ্যে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। তাঁর মতে, ইসরায়েল এখন একটি চূড়ান্ত সমাধানের পথে হাঁটতে চায়।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের আগে শুক্রবার লেবাননের প্রেসিডেন্সি থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসে। সেখানে জানানো হয় যে, লেবানন এবং ইসরায়েলের পক্ষ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত দুই দেশের রাষ্ট্রদূত আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে বৈঠকে বসতে রাজি হয়েছেন। এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য হলো একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা এবং দুই দেশের মধ্যে চলমান সীমান্ত সংঘাতের অবসান ঘটানো। ইসলামাবাদে পাকিস্তান যেমন ইরান ও মার্কিন আলোচনার মধ্যস্থতা করছে, লেবানন ও ইসরায়েল সংকটে একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রধান সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করছে।

নেতানিয়াহুর এই শর্তগুলো বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। হিজবুল্লাহ কেবল লেবাননের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়, বরং দেশটির রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইরানের সমর্থনপুষ্ট এই গোষ্ঠীকে পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ করা লেবানন সরকারের একার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। 

অন্যদিকে, লেবাননের উপ প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন যে, শান্তি আলোচনাকে কার্যকর করতে হলে ইসরায়েলকে অবশ্যই তাদের ভূখণ্ডে হামলা বন্ধ করতে হবে। ফলে একদিকে ইসরায়েলের নিরস্ত্রীকরণ শর্ত এবং অন্যদিকে লেবাননের হামলা বন্ধের দাবি, এই দুইয়ের মাঝে সমতা আনা ওয়াশিংটন বৈঠকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের অশান্ত রাজনীতিতে নতুন একটি মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে যখন ইরানের সাথে আমেরিকার আলোচনা চলছে, তখন লেবানন ও ইসরায়েলের এই শান্তি প্রক্রিয়ার উদ্যোগ সামগ্রিক আঞ্চলিক যুদ্ধের উত্তেজনা কিছুটা প্রসমিত করতে পারে। 

তবে হিজবুল্লাহর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নেতানিয়াহুর কঠোর অবস্থান এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্থায়ী শান্তির স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করছে আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে হতে যাওয়া রাষ্ট্রদূত পর্যায়ের বৈঠকের ওপর। বিশ্ববাসী এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে দেখার জন্য যে, এই বারুদঠাসা অঞ্চলে শেষ পর্যন্ত শান্তির সুবাতাস বয় কি না।

জেএইচআর