ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের বিরল আলোচনা: ইরান যুদ্ধের আবহে নতুন কূটনৈতিক মোড়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ১৫, ২০২৬, ০৯:২৫ এএম
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী Marco Rubio যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত Yechiel Leiter এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত লেবাননের রাষ্ট্রদূত Nada Hamadeh Moawad-এর সঙ্গে বৈঠক করেন।

ওয়াশিংটন, ডি.সি. দীর্ঘ কয়েক দশকের বৈরিতা এবং চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাঝেই এক ঐতিহাসিক ও বিরল কূটনৈতিক ঘটনার সাক্ষী হলো মার্কিন রাজধানী। ১৯৮৩ সালের পর এই প্রথম ইসরায়েল এবং লেবাননের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা সরাসরি আলোচনায় বসলেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এর সঞ্চালনায় মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যদিও দুই পক্ষই আলোচনার পরিবেশকে ইতিবাচক বলে বর্ণনা করেছে, তবে যুদ্ধবিরতির প্রশ্নে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ এক চরম উত্তেজনাকর পর্যায়ে রয়েছে। গত ৮ এপ্রিল ইরানের সাথে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও লেবানন সীমান্তে সংঘাত থামেনি। এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনে দুই দেশের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে প্রায় দুই ঘণ্টা ব্যাপী আলোচনা চলে। ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লিটার লেবাননের সাথে কোনো প্রকার যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা আপাতত নাকচ করে দিয়েছেন। ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য হলো লেবাননের মাটি থেকে হিজবুল্লাহকে নির্মূল করা এবং একটি নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। 

অন্যদিকে, লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ মোয়াদ অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানান। তিনি দেশের ১.১ মিলিয়নেরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের ঘরে ফেরা এবং মানবিক সংকট দূর করার ওপর জোর দেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বৈঠকের পর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, দশকের পর দশক ধরে চলা এই জটিলতা একদিনে মেটানো সম্ভব নয়, আরও সময়ের প্রয়োজন।

আলোচনা চলাকালীন লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এই বৈঠকের তীব্র বিরোধিতা করেছে। তারা এই আলোচনায় অংশ নেয়নি, বরং উত্তর ইসরায়েলে রকেট ও ড্রোন হামলা আরও জোরদার করেছে। মঙ্গলবার একদিনেই হিজবুল্লাহ ২৪টি হামলার দাবি করেছে। 

অন্যদিকে, ইসরায়েলি বিমান বাহিনী লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল এবং টায়ার শহরে ভারী বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। ৮ এপ্রিলের সেই ভয়াবহ দিনটির কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, যখন ইসরায়েলি হামলায় বৈরুতসহ লেবাননের বিভিন্ন প্রান্তে ৩৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল।

এই যুদ্ধের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানে হামলা চালালে এই বৃহৎ যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। বর্তমানে ইরান ও মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের দাবি যে লেবাননও ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলছে, লেবানন এই চুক্তির বাইরে। 

যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কৌশলগত দিক হলো হরমুজ প্রণালী। যদি ইরান এই জলপথ অবরোধ করে, তবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। যদিও এটি ইরানের নিজস্ব অর্থনীতির জন্যও আত্মঘাতী হতে পারে, তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কোণঠাসা হয়ে পড়লে ইরান এই পথটি বেছে নিতে পারে যা বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামাতে সক্ষম।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদী পর্যন্ত এলাকাকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ না করা পর্যন্ত তারা পিছু হটবে না। ইসরায়েল সেখানে একটি স্থায়ী নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা করছে। তবে সমালোচকরা একে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পুনর্নির্ধারণ এবং লেবাননের ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। যুদ্ধের কবলে থাকা তেহরানের জনজীবন এখন বিপর্যস্ত। 

বিমান হামলার আতঙ্ক এবং আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। ইরানের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে যে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে তেহরানও তাদের সাথে করা যুদ্ধবিরতি চুক্তি থেকে সরে আসতে বাধ্য হবে।

ওয়াশিংটনের এই বৈঠকটি এক দিক থেকে ঐতিহাসিক হলেও, সাধারণ লেবাননি বা ইসরায়েলিদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো স্বস্তি বয়ে আনেনি। একদিকে চলছে ড্রোন ও মিসাইল হামলা, অন্যদিকে কূটনৈতিক টেবিলে চলছে কথার লড়াই। লেবানন কি হিজবুল্লাহর প্রভাবমুক্ত হয়ে শান্তির পথে হাঁটবে, নাকি ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধের বলি হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, লেবাননে এ পর্যন্ত ২,১২৪ জন নিহত হয়েছেন এবং ১১ লক্ষের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। উল্লেখ্য যে, এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে এবং বিরল এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো ১৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে।

জেএইচআর