বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ২০২৬ সালটি একটি অত্যন্ত উত্তাল সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। একদিকে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং অন্যদিকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা অভ্যন্তরীণ মতভেদ আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পেনকে ন্যাটো থেকে স্থগিত করার সম্ভাবনার খবরটি এই উত্তজনাকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সালে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর আক্রমণ চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি তেল পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন এই যুদ্ধে ন্যাটোর ইউরোপীয় মিত্রদের কাছ থেকে সক্রিয় অংশগ্রহণ আশা করেছিল। কিন্তু স্পেনের মতো দেশগুলো যখন তাদের আকাশসীমা বা সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন থেকেই ওয়াশিংটনের সাথে মাদ্রিদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, পেন্টাগনের একটি অভ্যন্তরীণ ইমেলে এমন কিছু পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে যা মিত্র দেশগুলোকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে যারা যুক্তরাষ্ট্রের ইরান অভিযানে পূর্ণ সমর্থন দেয়নি। এই তালিকায় স্পেনের নাম শীর্ষস্থানে রয়েছে। স্পেন তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটি, রোটাল নেভাল স্টেশন এবং মোরন এয়ার বেস, ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালানোর অনুমতি দেয়নি। পেন্টাগনের প্রেস সেক্রেটারি কিংসলে উইলসন অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার ন্যাটো মিত্রদের জন্য যা কিছু করেছে তার বিপরীতে তারা আমাদের পাশে ছিল না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিশ্চিত করবেন যেন আমাদের মিত্ররা আর কাগুজে বাঘ হয়ে না থাকে, বরং তারা তাদের দায়িত্ব পালন করে।
মার্কিন হুমকি সত্ত্বেও ন্যাটো জোটের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, জোটের প্রতিষ্ঠাতা চুক্তিতে কোনো সদস্য রাষ্ট্রকে স্থগিত বা বহিষ্কার করার কোনো বিধান নেই। বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে ন্যাটোর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, ১৯৪৯ সালের ন্যাটোর উত্তর আটলান্টিক চুক্তিতে সদস্যপদ বাতিলের কোনো আইনি সুযোগ রাখা হয়নি। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ এই প্রতিবেদনকে নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, স্পেন কোনো লিক হওয়া ইমেল বা জল্পনার ভিত্তিতে কাজ করে না, বরং সরকারি নথির ভিত্তিতে কাজ করে। তিনি উল্লেখ করেন যে, স্পেন মিত্রদের সাথে সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক, তবে তা অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে হতে হবে।
পেন্টাগনের ওই ইমেলে কেবল স্পেন নয়, বরং যুক্তরাজ্যের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে, যদি ব্রিটেন মার্কিন স্বার্থে পুরোপুরি সায় না দেয়, তবে দক্ষিণ আটলান্টিকে ব্রিটিশ শাসিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর যুক্তরাজ্যের দাবি থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার সমর্থন সরিয়ে নিতে পারে। পরিবর্তে আর্জেন্টিনা এই দ্বীপগুলোর ওপর যে দাবি করে আসছে, তাকে সমর্থন দেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এটি সরাসরি যুক্তরাজ্যের সার্বভৌমত্বের ওপর একটি বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার অবশ্য জানান, বর্তমানে ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ বা যুদ্ধে সরাসরি আরও বেশি জড়িয়ে পড়া যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে নয়। যদিও ব্রিটেন তাদের ঘাঁটি ব্যবহার এবং ড্রোন ভূপাতিত করার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছে, তবুও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে তারা অনীহা প্রকাশ করেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ইউরোপীয় দেশগুলোর সমালোচনা করে বলেন, দশকের পর দশক ধরে ইউরোপ এবং এশিয়া মার্কিন সুরক্ষার অধীনে বিনা পয়সায় সুবিধা ভোগ করেছে, কিন্তু সেই সময় এখন শেষ। তিনি মন্তব্য করেন যে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে ইউরোপের ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি হবে, তাই ইউরোপীয়দের উচিত বড় বড় আলোচনা না করে সরাসরি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে সহায়তা করা।
স্পেনের সদস্যপদ নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে, তখন জার্মানি ও ইতালি ন্যাটোর ঐক্যের পক্ষে কথা বলেছে। জার্মানির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, স্পেনের সদস্যপদ নিয়ে কোনো সংশয় নেই এবং তারা স্পেনের পাশেই আছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ন্যাটো জোটকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি একটি শক্তির উৎস এবং ইউরোপীয় স্তম্ভকে আরও শক্তিশালী করতে হবে যা মার্কিন শক্তির পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, ন্যাটো আর আগের মতো একটি এককেন্দ্রিক আদর্শে পরিচালিত হচ্ছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোকে একটি একমুখী রাস্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র কেবল রক্ষা করে কিন্তু প্রতিদান পায় না। এই মানসিকতা ন্যাটোর মতো একটি ঐতিহাসিক জোটের অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। বর্তমানে যে মূল সমস্যাগুলো সামনে এসেছে তার মধ্যে রয়েছে প্রবেশাধিকার এবং ঘাঁটি ব্যবহারের সুবিধা। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে মিত্রদের ঘাঁটি ব্যবহারের অধিকার তাদের ন্যূনতম অধিকার। অন্যদিকে সার্বভৌমত্ব বনাম জোটের স্বার্থের দ্বন্দ্বে স্পেন ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো নিজেদের পররাষ্ট্র নীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দায়বদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালীর সংকটের কারণে সৃষ্ট আঞ্চলিক অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলছে, যা মিত্রদের মধ্যে বিভেদ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
২০২৬ সালের এই সংকট ন্যাটোর ইতিহাসে গভীরতম ফাটলগুলোর একটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের মধ্যে যে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে, তার সমাধান যদি দ্রুত না হয়, তবে এই সামরিক জোটটি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। স্পেনকে বহিষ্কার করার আইনি ক্ষমতা ওয়াশিংটনের না থাকলেও, কূটনৈতিক এবং সামরিক অসহযোগিতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যে চাপ তৈরি করছে, তা বিশ্ব শান্তির জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত ন্যাটোর ঐক্য টিকে থাকবে নাকি এটি খণ্ড, বিখণ্ড হয়ে নতুন কোনো আঞ্চলিক জোটের জন্ম দেবে, তা সময়ই বলে দেবে। সূত্র: বিবিসি।