বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির ধমনী বলে পরিচিত পারস্য উপসাগর আজ এক অগ্নিগর্ভ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া ইরান-মার্কিন উত্তাপ এখন আর কেবল হুমকি-পাল্টা হুমকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল স্থাপনায় ইরানের হামলা এবং তার জবাবে মার্কিন নৌবাহিনীর 'ফাস্ট বোট' ধ্বংস করার ঘটনা বিশ্বকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের কিনারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নয়, বরং বিশ্ব জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিকেও এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং বিপুল পরিমাণ এলএনজি (LNG) যাতায়াত করে স্ট্রেট অফ হরমুজ বা হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান ও ইসরায়েলের ওপর মার্কিন বিমান হামলার পর থেকে তেহরান এই কৌশলগত জলপথটি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। এর ফলে প্রায় ২,০০০ বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ২০,০০০ নাবিক গত কয়েক মাস ধরে সেখানে আটকা পড়ে আছেন।
এই অচলাবস্থা কাটাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম'।এর উদ্দেশ্য হলো মার্কিন সামরিক পাহারায় আটকে পড়া জাহাজগুলোকে নিরাপদ জলসীমায় বের করে আনা। সোমবার মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজ 'অ্যালায়েন্স ফেয়ারফ্যাক্স' এই প্রকল্পের অধীনে সফলভাবে প্রণালী পার হয়েছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি একে 'প্রজেক্ট ডেডলক' বা অচলাবস্থার প্রকল্প বলে উপহাস করেছেন, যা স্পষ্ট করে দেয় যে কূটনৈতিক আলোচনার পথ বর্তমানে রুদ্ধ।
সোমবারের ঘটনাপ্রবাহ ছিল অত্যন্ত নাটকীয়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, তারা হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সাতটি 'ফাস্ট বোট' বা দ্রুতগামী নৌযান ধ্বংস করেছে। মার্কিন হেলিকপ্টার ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষায়, ইরানের কাছে এখন আর খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট নেই। যদিও ইরান এই নৌকা ধ্বংসের খবর অস্বীকার করেছে এবং পাল্টা দাবি করেছে যে, তারা একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে।
সংঘাতের সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) ওপর সরাসরি আক্রমণ। ফুজাইরা বন্দর, যা আমিরাতের বৃহত্তম তেল সংরক্ষণাগার এবং কৌশলগত বন্দর, সেখানে ইরানি হামলার ফলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। আমিরাত সরকারের দাবি অনুযায়ী:
তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১২টি ব্যালিস্টিক মিসাইল, ৩টি ক্রুজ মিসাইল এবং ৪টি ড্রোন ধ্বংস করেছে।
ফুজাইরা বন্দরে হামলায় অন্তত ৩ জন আহত হয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি জাহাজ এবং আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা অ্যাডনক (Adnoc)-এর একটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ওমান সীমান্তবর্তী এলাকা বুখাতেও একটি আবাসিক ভবনে হামলা হয়েছে, যাতে ২ জন সাধারণ নাগরিক আহত হয়েছেন। এই আক্রমণগুলো প্রমাণ করে যে ইরান এখন সরাসরি প্রতিবেশী দেশগুলোর অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
এই সংঘাতের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে বিশ্ব বাজারে। ফুজাইরা বন্দরে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা একদিনেই ৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।
এই হামলার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই হামলাকে অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য বলে নিন্দা জানিয়েছেন এবং আমিরাতের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে কাতার এই হামলার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার দাবি তুলেছে। তেহরান সামরিক পন্থার সমালোচনা করে বলেছে যে, রাজনৈতিক সংকটের কোনো সামরিক সমাধান হতে পারে না।
রাজনীতি এবং যুদ্ধের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার নাবিকের মানবিক অধিকার। প্রায় ২০,০০০ সমুদ্রকর্মী কয়েক মাস ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। খাদ্য ও পানীয় জলের সংকট এবং মানসিক অবসাদ তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই মানবিক সংকটের দোহাই দিয়েই সামরিক হস্তক্ষেপের ন্যায্যতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন।
২০২৬ সালের মে মাসে দাঁড়িয়ে বিশ্ব আজ এক বিশাল বিবর্তনের সাক্ষী। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' এবং অন্যদিকে ইরানের কঠোর প্রতিরোধ- এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি। যদি দ্রুত কোনো কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তবে এই ছোট ছোট সংঘর্ষ একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বরং প্রতিটি সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছাবে।
ফুজাইরা বন্দরে জ্বলা আগুন কেবল একটি তেলের ডিপোর আগুন নয়, এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার অস্থিরতার প্রতীক। আগামী কয়েক দিন বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সংকটময় হতে চলেছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
এএন