তামিলনাড়ু রাজনীতির নতুন সূর্যোদয়

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন বিজয়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মে ১০, ২০২৬, ১১:১৬ এএম
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন বিজয়/ ছবি: টিভিকে

তামিলনাড়ুর রাজনীতির রুপালি পর্দা আর বাস্তব জীবনের লড়াই যেন আজ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেন চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয়, যিনি কোটি ভক্তের কাছে 'থালাপতি বিজয়' নামেই পরিচিত। 

তবে ক্ষমতা গ্রহণের পর কেবল উৎসবের আমেজেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। শপথের রেশ কাটতে না কাটতেই সোজা চলে যান সচিবালয়ে এবং প্রথম দিনেই সই করেন এমন কিছু জনহিতকর আদেশে, যা রাজ্যের সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজয়ের প্রথম পদক্ষেপই ছিল মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের স্বস্তি ফেরানো। তিনি ঘোষণা করেছেন, রাজ্যের প্রতিটি আবাসিক গ্রাহকের জন্য মাসিক '২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে'প্রদান করা হবে। পাশাপাশি, নারীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে বিন্দুমাত্র আপস না করে রাজ্যে একটি 'বিশেষ নারী সুরক্ষা বাহিনী' গঠনের ঐতিহাসিক আদেশ দিয়েছেন তিনি।

আজ রোববার সকালে চেন্নাইয়ের রাজভবনে এক আবেগঘন পরিবেশে শপথ নেন থালাপতি বিজয়। ডিএমকে (DMK) ও এআইএডিএমকে (AIADMK)-এর মতো শক্তিশালী প্রথাগত রাজনৈতিক শক্তিকে পেছনে ফেলে বিজয়ের এই জয়কে ভারতের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। শপথ অনুষ্ঠান শেষে প্রথা অনুযায়ী ফাইলে সই করার সময় বিজয় বুঝিয়ে দিয়েছেন, তার সরকার হবে 'অ্যাকশন-ওরিয়েন্টেড' বা কর্মমুখী।

সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, মুখ্যমন্ত্রী পদে বসার পর তার প্রথম কলমের আঁচড় পড়ে বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত ফাইলে। 

নির্বাচনের আগে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ক্ষমতায় এলে সাধারণ মানুষের ওপর থেকে বিলের বোঝা লাঘব করবেন। সেই কথা রাখতেই ২০০ ইউনিট ফ্রি বিদ্যুতের ঘোষণা। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে তামিলনাড়ুর কোটি কোটি পরিবার সরাসরি উপকৃত হবে, বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির বাজারে এটি হবে এক বিশাল স্বস্তি।

কেবল অর্থনৈতিক সুবিধা নয়, সামাজিক সুরক্ষার দিকেও কঠোর নজর দিয়েছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। তামিলনাড়ুর নারীরা যাতে দিন-রাত নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারেন, সেজন্য তিনি পুলিশ প্রশাসনের অধীনে একটি বিশেষ দক্ষ বাহিনী বা 'স্পেশাল ফোর্সেস' তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন।

শপথ শেষে এক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বিজয় বলেন, 'জনগণ আমাকে যে ভালোবাসা ও বিশ্বাস দিয়ে এই আসনে বসিয়েছে, তার মর্যাদা রক্ষা করাই আমার একমাত্র ধর্ম। আমার মা-বোনদের সুরক্ষা এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোই হবে এই সরকারের অগ্রাধিকার।

তামিলনাড়ুর ইতিহাসে দীর্ঘকাল ধরে দ্রাবিড় রাজনীতির দুই ধারার লড়াই চলে আসছে। তবে থালাপতি বিজয়ের এই জয় এবং দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই জনমোহিনী ও কার্যকর পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করছে যে, তিনি কেবল অভিনেতা থেকে নেতা হতে আসেননি, বরং একটি স্থায়ী প্রশাসনিক পরিবর্তন আনতে চান।

বিশেষ করে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ প্রদানের বিষয়টি কর্ণাটক বা দিল্লির আম আদমি পার্টির মডেলের কথা মনে করিয়ে দিলেও, বিজয়ের অনুসারীরা একে 'তামিল গর্ব' ও 'জনসেবার নিজস্ব দর্শন' হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, থালাপতি বিজয়ের এই হার্ড-হিটিং স্টার্ট বিরোধীদের জন্য বড় চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর চেন্নাইসহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে। বিশেষ করে গৃহবধূরা ২০০ ইউনিট ফ্রি বিদ্যুতের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। অন্যদিকে, তরুণী ও কর্মজীবী নারীরা বিশেষ সুরক্ষা বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্তে আশার আলো দেখছেন।

তামিলনাড়ুর রাজনীতির এই নতুন অধ্যায় কোন পথে এগোয়, তা এখন দেখার বিষয়। তবে থালাপতি বিজয় যে 'ফিল্মি স্টাইলে' নয়, বরং একজন দক্ষ শাসকের মতো তার ইনিংস শুরু করেছেন, তা প্রথম দিনের আদেশেই স্পষ্ট।

এএন