চীন সফর শেষে তাইওয়ানকে স্বাধীনতা ঘোষণা না করার কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মে ১৬, ২০২৬, ০৮:০১ এএম
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তাইওয়ান বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। ছবি: সংগৃহীত

বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে দুই দিনের হাই-প্রোফাইল দ্বিপাক্ষিক সম্মেলন শেষ করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় তাইওয়ানকে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা না করার ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

শুক্রবার ফক্স নিউজকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, তিনি চান না কেউ নতুন করে স্বাধীনতা ঘোষণা করুক। 

বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সাথে দুই দিনব্যাপী আলোচনা শেষে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে তিনি এই মন্তব্য করেন। ট্রাম্পের এই বক্তব্য স্বশাসিত দ্বীপ রাষ্ট্র তাইওয়ান, চীন এবং আমেরিকার মধ্যকার দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন এক উত্তেজনার মুখে দাঁড় করিয়েছে।

ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাইওয়ান সংকট নিয়ে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাব্যতার দিকে ইঙ্গিত করে বেশ খোলামেলা ও বাস্তববাদী অবস্থান নেন। তিনি বলেন, সবাইকে বুঝতে হবে, একটি যুদ্ধের জন্য তাদের প্রায় ৯,৫০০ মাইল বা ১৫,২৮৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। তিনি এমন কোনো পরিস্থিতির মধ্যে জড়াতে চাচ্ছেন না। তিনি চান তাইওয়ান শান্ত হোক এবং চীনও শান্ত হোক।

হোয়াইট হাউসে ফেরার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প জানান, বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। তবে চীন যদি তাইওয়ানে আক্রমণ করে, তবে আমেরিকা সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ করবে কি না, এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট শি এই দ্বীপটিকে নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তিনি সেখানে কোনো ধরনের স্বাধীনতার আন্দোলন দেখতে চান না।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতে, পরিস্থিতি এখন যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকা উচিত। তিনি বলেন, পরিস্থিতি যেভাবে আছে, সেভাবে রাখলে তাঁর মনে হয় চীন তা মেনে নেবে। কিন্তু আমেরিকার সমর্থন আছে, এই ভরসায় কেউ হুট করে স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসুক, তা তারা চান না।

চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দুই নেতার বন্ধ দরজার পেছনের বৈঠকে শি জিনপিং তাইওয়ান ইস্যুটি অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপন করেছেন। শি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে বলেন, সম্পর্কের মূল ভিত্তি চীন-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাইওয়ান ইস্যুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। এই বিষয়টি যদি সঠিকভাবে সামলানো না হয়, তবে দুই পরাশক্তি একে অপরের মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসতে পারে, এমনকি সরাসরি সামরিক সংঘাত বা যুদ্ধও বেঁধে যেতে পারে।

তবে ট্রাম্প আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, চীনের সাথে এখনই কোনো যুদ্ধের আশঙ্কা তিনি দেখছেন না। তিনি বলেন, না, তাঁর মনে হয় না কোনো যুদ্ধ হবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকবে। শি জিনপিং নিজেও যুদ্ধ চান না।

তাইওয়ানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে অবশ্য এর আগেই একাধিকবার বলেছেন, তাইওয়ানের নতুন করে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ তাইওয়ান ইতিমধ্যে নিজেকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবেই বিবেচনা করে এবং সেভাবেই নিজের শাসনকার্য পরিচালনা করে।

আমেরিকার দীর্ঘদিনের নীতি হলো, তারা তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করে না, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাইওয়ানকে নিজস্ব প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করতে বাধ্য। বেইজিংয়ের সাথে diplomatic বা কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার শর্তই হলো ‘এক চীন নীতি’ বা ওয়ান চায়না পলিসি স্বীকার করে নেওয়া, যার অর্থ বেইজিংই চীনের একমাত্র বৈধ সরকার।

তাইওয়ানের সাধারণ জনগণের সিংহভাগই বর্তমানে ‘স্ট্যাটাস কো’ বা বর্তমান স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পক্ষে। অর্থাৎ, তারা চীনের সাথে একীভূত হতেও চায় না, আবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে চীনের সামরিক আক্রমণের ঝুঁকিও নিতে চায় না। বেইজিং অবশ্য তাইওয়ানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে-কে শুরু থেকেই একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং শান্তি বিনষ্টকারী হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছে।

সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের কাছে ১১ বিলিয়ন ডলারের, মতান্তরে ১৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত, উন্নত রকেট লঞ্চার ও মিসাইলসহ একটি বিশাল অস্ত্র প্যাকেজ বিক্রির ঘোষণা দিয়েছিল, যা নিয়ে বেইজিং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে।

এই অস্ত্র বিক্রির চুক্তিটি চূড়ান্ত হবে কি না, তা নিয়ে ট্রাম্প জানান তিনি দ্রুতই সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে এ বিষয়ে তিনি তাইওয়ানের নেতৃত্বের সাথে সরাসরি কথা বলার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, এই মুহূর্তে তাইওয়ানকে যিনি চালাচ্ছেন, আপনারা জানেন তিনি কে, তিনি তাঁর সাথে কথা বলবেন।

প্রথাগতভাবে, মার্কিন প্রেসিডেন্টরা তাইওয়ানের শীর্ষ নেতার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেন না, কারণ বেইজিং একে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং এক চীন নীতির লঙ্ঘন বলে মনে করে। ফলে ট্রাম্পের এই সম্ভাব্য ফোনালাপ বা সরাসরি আলোচনার ইঙ্গিত কূটনৈতিক মহলে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।

শনিবার তাইওয়ানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী চেন মিং-চি ট্রাম্পের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, ট্রাম্পের মন্তব্যের সুনির্দিষ্ট অর্থ এবং প্রেক্ষাপট তাইওয়ান সরকার খতিয়ে দেখবে। তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, আমেরিকার তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহ করার বিষয়টি মার্কিন আইনের বা তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট-এর অধীনে একটি স্বীকৃত বিষয়।

তিনি বলেন, তাইওয়ান ও আমেরিকার মধ্যকার অস্ত্র বিক্রির চুক্তি সবসময়ই এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

একই সাথে প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে-র একজন মুখপাত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ মূলত তাইওয়ানের নিরাপত্তার প্রতি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতির অংশ এবং এটি আঞ্চলিক হুমকি মোকাবেলায় একটি যৌথ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।

অন্যদিকে, তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিন চিয়া-লুং জানিয়েছেন, তাদের টিম শুরু থেকেই এই মার্কিন-চীন শীর্ষ সম্মেলনের ওপর কড়া নজর রাখছিল। তাইওয়ানের স্বার্থ রক্ষা এবং দুই দেশের সম্পর্ক সুদৃঢ় রাখতে তারা ওয়াশিংটনের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখছে। তিনি বেইজিংয়ের সমালোচনা করে বলেন, তাইওয়ান সবসময়ই শান্তির পক্ষে, পক্ষান্তরে চীনই এই অঞ্চলে আগ্রাসী সামরিক মহড়া চালিয়ে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বা স্টেট ডিপার্টমেন্ট তাদের ওয়েবসাইট থেকে ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা সমর্থন না করার’ পুরোনো একটি বাক্য বাদ দিলে চীন ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। বেইজিং সে সময় অভিযোগ করেছিল, আমেরিকা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভুল বার্তা দিচ্ছে। তবে এবারের বেইজিং সফরের পর ট্রাম্প বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, তাইওয়ান নিয়ে আমেরিকার মূল নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য মূলত একটি ব্যবসায়িক ও কৌশলগত অবস্থান। তিনি একদিকে যেমন চীনের সাথে বাণিজ্য ও ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি বড় চুক্তি করতে চান, ঠিক তেমনি আমেরিকার সাধারণ মানুষকে এই বার্তা দিতে চান যে, তাঁর প্রশাসন দূরবর্তী কোনো দেশের জন্য মার্কিন সেনাদের যুদ্ধের ময়দানে পাঠাতে আগ্রহী নয়। তবে ট্রাম্পের এই কুল ডাউন বা শান্ত হওয়ার পরামর্শ তাইওয়ান কীভাবে নেয় এবং আমেরিকার দীর্ঘদিনের এশীয় মিত্ররা একে ওয়াশিংটনের পিছু হটে যাওয়া হিসেবে দেখে কি না, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: বিবিসি

জেএইচআর