যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা গভর্নমেন্ট কমিউনিকেশনস হেডকোয়ার্টারস (জিসিএইচকিউ) এর প্রধান অ্যান কিস্ট-বাটলার সতর্ক করে দিয়ে বলেন, রাশিয়া প্রতিদিনই ব্রিটেন ও ইউরোপের বিরুদ্ধে ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ চালিয়ে যাচ্ছে। এক ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন, মস্কো তাদের গোপন হামলা ও সাইবার তৎপরতা ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলছে।
অ্যান কিস্ট-বাটলার জানান, রাশিয়া অবিরামভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সরবরাহ চেইন এবং জনগণের আস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তাঁর মতে, এসব কর্মকাণ্ড ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাইব্রিড যুদ্ধ বলতে মূলত এমন কৌশলকে বোঝায়, যেখানে সরাসরি সামরিক হামলার পাশাপাশি সাইবার আক্রমণ, নাশকতা, ভুয়া তথ্য ছড়ানো, গুপ্তচরবৃত্তি কিংবা গুপ্তহত্যার মতো গোপন কর্মকাণ্ড চালানো হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে ফেলা।
সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হেইলি অভিযোগ করেন, রুশ সাবমেরিনগুলো ব্রিটিশ জলসীমার গুরুত্বপূর্ণ পানির নিচের অবকাঠামোর আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। অন্যদিকে পোল্যান্ডের বিদ্যুৎ গ্রিডে সাইবার হামলার জন্য দেশটির কর্তৃপক্ষ রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবি কে দায়ী করেছে। এর আগে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র জানিয়েছিল, ব্রিটেনে সংঘটিত বড় ধরনের সাইবার হামলার পেছনে রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো রাষ্ট্রের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
বুধবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক গোয়েন্দা কেন্দ্র ব্লেচলি পার্কে প্রথমবারের মতো বার্ষিক জিসিএইচকিউ বক্তৃতা দেবেন অ্যান কিস্ট-বাটলার। সেখানে তিনি বলবেন, রাশিয়া যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিরুদ্ধে প্রতিদিনের হাইব্রিড কর্মকাণ্ড বাড়িয়ে তুলছে। এই আগ্রাসনের মুখে জিসিএইচকিউ ও তার মিত্ররা সাইবার হামলা প্রতিহত করা, পশ্চিমা প্রযুক্তি পাচার ঠেকানো এবং নাশকতা ও গুপ্তহত্যার চেষ্টা ব্যর্থ করতে নিরলসভাবে কাজ করছে। তিনি আরও দাবি করবেন, ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছেন, যার পেছনে ব্রিটিশ সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
এই ভাষণটি যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা চুক্তির ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পরে এতে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড যুক্ত হয়ে গঠিত হয় বর্তমান ‘ফাইভ আইস’ জোট। তবে এই সময়ে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কিছুটা উত্তেজনাপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ব্রিটেনকে ‘একসময়ের মহান মিত্র’ বলে মন্তব্য করেন এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরীগুলোকে ‘খেলনা’ বলে কটাক্ষ করেন।
অ্যান কিস্ট-বাটলার তার ভাষণে চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকেও বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরবেন। তিনি বলবেন, চীন এখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে একটি সুপারপাওয়ার এবং তাদের গোয়েন্দা, সাইবার ও সামরিক সক্ষমতা অত্যন্ত উন্নত। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন দীর্ঘদিন ধরেই চীনের বিরুদ্ধে মেধাস্বত্ব চুরি ও উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ করে আসছে, যদিও বেইজিং এসব অভিযোগ বরাবরই প্রত্যাখ্যান করেছে।
জিসিএইচকিউ প্রধান সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানাবেন। তাঁর মতে, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বোর্ডরুম থেকে বসার ঘর পর্যন্ত সবার সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। তিনি সাধারণ মানুষকে পাসওয়ার্ডের বদলে নিরাপদ পাসকি ব্যবহারের পরামর্শ দেবেন এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সরবরাহ ব্যবস্থার সুরক্ষা জোরদারের আহ্বান জানাবেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তৃতার মাধ্যমে জিসিএইচকিউ নিজেদের কার্যক্রম ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মূলত জনসচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
জেএইচআর