অনলাইনে পরিচয়, পরিচয়ের এক বছরের মাথায় মেঘলা আর জিসান বিয়ে করলো। বিয়ের পরে এই প্রথমবার মেঘলা স্বামীর সাথে একসাথে অনেকদিন কাটালো। অতঃপর ঘোর অমানিশা নেমে আসলো মেঘলার জীবনে। হৃদয়ে জমানো পুঞ্জীভূত মেঘের সনে প্রতিটি মুহূর্ত সংগ্রাম করে বেঁচে আছে।
রাতের আধারে তারার মিতালী, গভীর রজনী মিটমিট করে জ্বলন্ত জোনাকিদের বাহুডোরে আঁকড়ে ধরলো। রাতটা কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। এপাশ ওপাশ করতেই মনে হলো এই বুঝি ভোর হয়ে গেল। চোখের পলক পড়ছে না আর। ভোরের পাখিদের কিচির মিচিরে মেঘলা তড়িঘড়ি করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে।
ট্রলি ব্যাগে একটা শাড়ি আর কয়েকটি থ্রিপিসি ভাঁজ করে গুছিয়ে নেয়। ফ্রেশ হয়ে হালকা নাশতা করে ভাবছে কোন পোশাক টা পড়বে। মেঘলা ফর্সা যে কোনো পোশাকেই তাকে ভালো লাগে। তারপরও ভাবনার জগতে বিভোর কোন কালারে তাকে বেশি সুন্দর লাগবে।
মেঘলা ভোর ৫টায় বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে। ১১টা ৪৫ মিনিটে চট্টগ্রাম পৌঁছে যায়। ট্রেনের টিকেট না পাওয়ায় মেঘলাকে আজ বাসে করেই ঢাকা যেতে হয়। যদিও বাসে ভ্রমণ মেঘলার একদম পছন্দ না। ২টা বাজে বাস ছাড়লো মেঘলা জানালার পানে চেয়ে আছে। প্রকৃতি আজ কতো সুন্দর!
রাত ৮টায় বাস সায়েদাবাদ পৌঁছায়। অনেকক্ষণ ধরেই মেঘলা রাস্তার পাশে জিসানের জন্য অপেক্ষা করছিল। একটা তরুণী ঢাকা শহরের রাস্তার ধারে তার প্রিয় মানুষটার জন্য একা দাঁড়িয়ে থাকা মানে কতোটা রিস্ক বুঝতেই পারছেন।
মেঘলা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। অতঃপর জিসানকে দেখতে পেলো। মেঘলা জিসানকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলো। ঢাকা শহরে দু’জনেরই আত্মীয়-স্বজন অনেক আছে, তারপর ও আত্মীয়ের বাড়িতে না উঠে জিসানের এক বন্ধুর বাসায় উঠে।
জিসানের বন্ধুর বাসা থেকে পরদিন মেঘলার বান্ধবীর বাসায় উঠে। মেঘলা একজন শিক্ষিকা। মেঘলার বান্ধবী হীরা কলেজের প্রভাষক এবং তার স্বামী একি কলেজের অধ্যাপক। তিনদিন তারা হীরার বাসায় বেশ আরাম-আয়েশ করেই ছিল। এখন তারা কোথায় উঠবে ভেবে অস্থির।
জিসানের জেঠাতো ভাইয়ের বাসা ঢাকাতেই। মেঘলা অনেকবার জিসানকে তার জেঠাতো ভাইয়ের বাসায় উঠতে বলে, কিন্তু জিসান একরোখা কিছুতেই আত্মীয়ের বাসায় উঠবে না। অবশেষে জিসানের এক বান্ধবীর বাসায় উঠে সাভারে। জিসানের বান্ধবী রোজীর নিজস্ব বাড়ি, তবে রুমগুলো অতোটা পরিপাটি ছিল না। মেঘলা এমন পরিবেশে কখনো ছিল না।
মেঘলা জিসানের দ্বিতীয় স্ত্রী। রোজী জানতো না জিসান মেঘলাকে বিয়ে করেছে। মেঘলা রোজীও পরিচিত। মেঘলা অত্যান্ত সহজ সরল, নম্র, ভদ্র ও শান্তশিষ্ট মেয়ে। ভাগ্যদোষে মেঘলা বিধবা। দুই সন্তান নিয়ে একাকীই জীবনযাপন করে। জিসান মেঘলার সবকিছু জেনেই বিয়ের প্রস্তাব দেয়। যদিও মেঘলা রাজি ছিল না কিন্তু জিসান তার চতুরতা দিয়ে মেঘলাকে আপন করে নেয়।
রোজীর বাড়িতে দ্বিতীয় দিন, জিসান আর রোজী গল্প করছিল। মেঘলা জিসানের কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। এই যে চির শান্তির ঘুম; নেই কোনো দুঃখ-কষ্ট। জিসান মেঘলার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে রোজীকে বলছে আমি ছাড়া মেঘলার এই পৃথিবীতে আপন বলতে আর কেউ নেই, মেঘলার বাবাও মারা গেছে।
মেঘলা জিসানকে আরও জড়িয়ে ধরে। এমতাবস্থায় রোজী জিসানকে বলে তোমার রেস্ট নাও আমি আসি। মেঘলা আর জিসান একটা বদ্ধ কামরায়। মেঘলা চোখ খুলতেই দেখে জিসান তাকে কোল থেকে নামিয়ে শুইয়ে দিচ্ছে। মেঘলা জিসানকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগলো। এই ছিলো মেঘলার জীবনে পরম সুখের কান্না। জীবনে এতো সুখ কখনো পায়নি মেঘলা।
জিসান মেঘলাকে আলিঙ্গন করে বলে কাঁদছো কেন পাগলি, আমি শুধু তোমারই।
তৃতীয় দিন মেঘলা বায়না ধরলো ঘুরতে যাবে...। জিসান মেঘলাকে নিয়ে দুপুরের পর বের হলো। হঠাৎ জিসানের মুডঅফ, মেঘলার কোনো কথাই কানে নিচ্ছে না। বাদামওয়ালাকে দেখে বললো, এই আসো বাদাম খাবো তাতেও কোনো সাড়া দিল না জিসান। বাদাম মেঘলার খুব প্রিয় কিন্তু জিসানের কোনো রেসপন্স না পেয়ে আর খাওয়া হলো না। কিছুক্ষণ ঘুরে চলে এলো তারা।
জিসানের এমন আচরণ দেখে মেঘলা কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়ছে। রোজীর অনেক জোরাজোরির পর মেঘলা ডাইনিং—এ বসলো। কিছুতেই খাবার গলা দিয়ে নামছে না। অঝোরে মেঘলার দু’চোখ বয়ে পানি ঝরছিল। মেঘলা বুজতে পারছে তাকে ঘুরতে নিতে বলাতে জিসানের স্বার্থে লেগেছে।
জিসানের কার্পন্যতা নাকি মেঘলার দায়িত্ব এড়াতে চাচ্ছে কিছুতেই হিসাব মিলাতে পারছেনা মেঘলা।
পরদিন তারা রোজীর বাড়ি থেকে চলে যায়। মেঘলাকে বাড়ির উদ্দেশ্যে ছেড়ে দিতে জিসান ট্রেন স্টেশন আসে। মেঘলার কান্নায় স্টেশনের মানুষ হতবাক, জিসানও মেঘলার কান্না থামাতে পারছে না। স্বামীকে রেখে যেতে মেঘলার হৃদয়টা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে স্বামীর এমন আচরণ তার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।
ভোর সাতটায় ট্রেন ছাড়লো, জিসান হাত নেড়ে মেঘলাকে বিদায় জানালো। ট্রেন ছুটছে আর ছুটছে...। ট্রেনের খোলা বাতায়নে নীল আকাশের পানে চেয়ে চেয়ে অশ্রুজলে যেনো পুরো পথ বৃষ্টিস্নাত হয়ে যাচ্ছে।
দুপুর একটায় মেঘলা গন্তব্যস্থলে পৌঁছায়। স্বামীর কথা ভুলতে পারছে না। এই আট-নয়টা দিন স্বামীর সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত মানসপটে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। আর ভাবছে জিসান কী তার দায়িত্ব নিবে? নাকি প্রতারণা করবে?
স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে দায়িত্ব, কর্তব্য, অধিকার এই তিনটি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এর একটিও ব্যতিরেকে সম্পর্কের ফাঁটল ধরে। জিসান মেঘলার কোনো দায়ভারই নেয়নি। মেঘলা এইসব ভেবে অস্থির হয়ে যায়। অনেক সময় সেন্সলেন্স হয়ে হসপিটালাইজড হয়।
জিসানের কাছ থেকে আসার প্রায় দেড় মাস পর মেঘলা জানতে পারে সে প্রেগন্যান্ট। মেঘলা বিষয়টি জিসানকে জানায়, জিসান যদিও আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় কিন্তু তার চোখে মুখে চিন্তার মূর্তি প্রকাশ পায়। বুঝতে আর বাকি রইলো না জিসান তার সন্তানের দায়ভার নিতে অপারগ। এরই মধ্যে মেঘলা অসুস্থ হয়ে পড়ে। জিসানের কাছে তার সুস্থতা, অসুস্থতা কিছুই যায় আসে যায় না। জিসান এখনো মেঘলাকে সামাজিক স্বীকৃতি দেয়নি। এমতাবস্থায় মেঘলা কোন পরিচয়ে অনাগত সন্তান লালন পালন করবে।
এরই মধ্যে জিসানের প্রথম স্ত্রীর সাথে ফোনে মেঘলার দু’চার বার আলাপ হয়। খুব খারাপ ব্যবহার করেছে মেঘলার সাথে। মেঘলা এতে মানসিকভাবে আহত হয়। জিসানকে তার প্রথম স্ত্রীর ব্যবহার সম্পর্কে জানানো হয়, এতে জিসান কোনো রিয়েক্ট করলো না।
মেঘলার প্রতি জিসানের এই অবহেলা মানসিক যন্ত্রণা দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একটা বাচ্চাকে কিভাবে পৃথিবীর মুখ দেখাবে। জিসান মেঘলার দায়িত্ব নেয়নি, সন্তানের দায়িত্ব নিবে? এইসব ভেবে মেঘলা বাচ্চা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে ফেলে। একটা বাচ্চাকে জন্মের পর কষ্ট না দিয়ে অঙ্কুরেই হত্যা করা শ্রেয় মনে হলো মেঘলার কাছে।
বিয়ের ছয় মাস না পেরতেই জিসান তার প্রথম বউ এবং বাপের কথায় চাকরি ছেড়ে নিজের বাড়িতে চলে যায়। বছরে দুই, একবার অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মেঘলা আর জিসানের সাক্ষাৎ হয় তাও আবার কোনো ফ্রেন্ডের বাড়ি অথবা আবাসিক হোটেলে। বিয়ের দুই বছর পর আর মোবাইলে ও তেমন যোগাযোগ করেন না। মেঘলা কল দিলে এড়িয়ে যায়। দ্বিতীয় বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েও মেঘলা স্বামীর সংসার করতে পারেনি। যুগলজীবন মেঘলার কাছে অধরাই থেকে গেল। মেঘলার জীবন যেনো আগ্নেয়গিরি এক জ্বলন্ত লাভা। না পেল বর, না পেল ঘর। নামহীন এক সম্পর্কের বেড়াজালে আবিষ্ট।
জিসানের কর্ণকুহরে পৌঁছায় না আর মেঘলার নিঃশব্দ আর্তনাদ।...
লেখক: সহকারী শিক্ষক, মহেশখালী কক্সবাজার।
ইএইচ