অন্তর্বর্তী সরকারের বিবৃতি

মাহফুজ আলমের বক্তব্যে বিভ্রান্তি এড়াতে স্পষ্টতা

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২৫, ০২:১২ পিএম

অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম নিয়েছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) ‘মিট দ্য রিপোর্টার্স’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, নভেম্বরেই ক্যাবিনেট ক্লোজ হয়ে যাবে... এরপর নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেবে।

এই মন্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয় জল্পনা, তাহলে কি নভেম্বরের পর আর উপদেষ্টা পরিষদের কার্যক্রম চলবে না? 

এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাওয়ার মধ্যেই সোমবার অন্তর্বর্তী সরকার এক লিখিত বিবৃতি জারি করে জানায়, উপদেষ্টা পরিষদ নির্বাচিত সরকারের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর না করা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে।

সরকারের এই ব্যাখ্যা আপাতভাবে বিভ্রান্তি দূর করলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এটি আবারও প্রমাণ করল, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরেই নীতিগত অস্পষ্টতা রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা করেছে, আগামী ফেব্রুয়ারিতেই অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এমন প্রেক্ষাপটে বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের মিত্ররা এই সরকারের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তাদের দাবি, এই সরকার নিরপেক্ষ নয়, বরং নির্বাচিত সরকারের প্রভাবাধীন। তারা চাচ্ছে সরকারটিকে তত্ত্বাবধায়ক আদলে রূপান্তর করতে।

এই রাজনৈতিক চাপে যখন সরকার সংস্কারকাজ ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে চাচ্ছে, ঠিক তখনই তথ্য উপদেষ্টার এমন মন্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি কি শেষ পর্যায়ে, নাকি এটি কৌশলগত এক সঙ্কেত?

অন্তর্বর্তী সরকারের বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়, নভেম্বরের পরও সংস্কার কার্যক্রম চলবে, এবং উপদেষ্টা পরিষদের সভাও নিয়মিত অনুষ্ঠিত হবে।

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর না করা পর্যন্ত উপদেষ্টা পরিষদ নিয়মিত দায়িত্ব পালন করবে।

অর্থাৎ, মাহফুজ আলমের বক্তব্যের বিপরীতে সরকার জানিয়েছে, নভেম্বর কোনো শেষ সময় নয়; বরং সংস্কারকাজ ও নীতিমালা প্রণয়ন চলবে নির্বাচনকালীন পুরো সময়জুড়ে।

সরকারের ভেতরের একাধিক সূত্র বলছে, উপদেষ্টা পরিষদের কিছু সদস্য নির্বাচনকালীন ভূমিকা নিয়ে আগেই সংশয়ে ছিলেন। তথ্য উপদেষ্টার মন্তব্য সেই সংশয়কে আরও উস্কে দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক আমলা ড. ফরিদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, একজন উপদেষ্টার বক্তব্য ও সরকারের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি যখন ভিন্ন বার্তা দেয়, তখন তা প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব নির্দেশ করে। নির্বাচনের আগে এটি সরকারের ভাবমূর্তির জন্য শুভ নয়।

অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, মাহফুজ আলম কেবল 'প্রক্রিয়াগত বাস্তবতা' বোঝাতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ, নভেম্বরের পর অনেক সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের অধীন হতে পারে। কিন্তু সেই বক্তব্য আংশিক উদ্ধৃত হওয়ায় বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। বিএনপি এই ঘটনাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আজ এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সরকার নিজেরাই বলছে নভেম্বরেই ক্যাবিনেট ক্লোজ হবে, মানে তারাও জানে এ সরকার স্থায়ী নয়। তাহলে কেন তারা এখনো নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক কাঠামো দিতে ভয় পাচ্ছে?

উপদেষ্টা পরিষদ তার মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবে-এটাই সাংবিধানিক সত্য। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই ‘সংস্কার’ শব্দটি আলোচনায়। দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন, ও মিডিয়া স্বাধীনতার মতো বিষয়ে এই সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।

তবে সরকার-বিরোধী উভয় পক্ষই একমত, এই সংস্কারের টেকসই বাস্তবায়ন এখনো শুরু হয়নি। কিছু উদ্যোগ কেবল প্রস্তাব আকারে আছে, কিছু খসড়ায় থেমে আছে।

এই অবস্থায় 'নভেম্বরের পর কাজ বন্ধ হয়ে যাবে', এমন ধারণা জনগণের মনে সংস্কার নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে। তাই সরকারের বিবৃতি কার্যত রাজনৈতিক ক্ষতি ঠেকানোর প্রয়াস হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্যে 'নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেবে' কথাটি নতুন একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, নির্বাচন কমিশন কি প্রশাসনিক ক্ষমতা গ্রহণ করবে, নাকি শুধু নির্বাচন আয়োজন করবে?

সংবিধান অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের সময় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন শুধু নির্বাচন প্রক্রিয়া তদারক করে। তাহলে নভেম্বরেই যদি উপদেষ্টা পরিষদ 'বন্ধ' হয়, তা হলে ক্ষমতার সেই শূন্যতা কে পূরণ করবে, এই প্রশ্নটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনআস্থা রক্ষা করা। ২০০৬-২০০৭ সালের অভিজ্ঞতা এখনো অনেকের মনে তাজা, যখন প্রশাসনিক অস্পষ্টতা থেকেই তৈরি হয়েছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা।

অর্থনীতিবিদ ড. নাসরিন রহমান বলেন, এই ধরনের মিশ্র বার্তা দেশের বাজার, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। একটি নির্বাচনকালীন সরকারের মূল শক্তি হলো স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা—এখন সেটিই প্রশ্নের মুখে।

তথ্য মন্ত্রণালয় সংস্কার বাস্তবায়ন সংক্রান্ত মাহফুজ আলমের মন্তব্য মূলত সময়সীমা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন-এমন ব্যাখ্যা দিয়েছে সরকারি সূত্র। তবে কিছু উপদেষ্টা মনে করেন, নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের ভেতরে দায়িত্ব বণ্টন, নীতিনির্ধারণ ও ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নভেম্বরের পর ক্যাবিনেট বৈঠক না হলেও প্রশাসন চালু থাকবে-এটা ঠিক। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো কীভাবে চলবে, সে বিষয়ে এখনো লিখিত নির্দেশনা আসেনি।

বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসনিক নীতির অস্পষ্টতা সবসময়ই রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এই ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের গতি বাড়াতে চাইছে, কিন্তু একই সঙ্গে নির্বাচনী নিরপেক্ষতার ভারসাম্য বজায় রাখা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য হয়তো প্রশাসনিক বাস্তবতা তুলে ধরেছিল, কিন্তু সেই বক্তব্যের রাজনৈতিক অভিঘাত বোঝাতে সরকার দেরি করেছে। ফলে জনগণের মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই সরকার আসলে কবে পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবে, আর কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করবে?'

অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এখন তিনটি বড় কাজ, নির্বাচনকালীন প্রশাসনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, সংস্কার কার্যক্রম দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখানো, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন করা।

তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য নিয়ে তৈরি বিতর্ক এই তিন ক্ষেত্রেই সরকারের সতর্কতা বাড়িয়ে দিয়েছে। নভেম্বর পেরিয়ে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে যখন নির্বাচন প্রক্রিয়া তীব্র হবে, তখন সরকারের প্রতিটি বার্তা আরও বেশি গুরুত্ব পাবে।

তাই এখন প্রয়োজন স্পষ্ট নীতি, একক ভাষ্য ও গণমাধ্যমে সমন্বিত বার্তা। অন্যথায়, সামান্য একটি ভুল উচ্চারণও নির্বাচনের আগের এই সংবেদনশীল সময়ে বড় রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের জনগণ এখন আর বিভ্রান্তি নয়, নিশ্চয়তা চায়, সরকার কখন, কীভাবে, কার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে, এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ভর করছে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক স্থিতি, এবং গণতন্ত্রের পরবর্তী অধ্যায়ের বিশ্বাসযোগ্যতা।

জেএইচআর