বিশ্বের প্রভাবশালী ৫০০ মুসলিমের তালিকায় তিন বাংলাদেশি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২৫, ১১:০২ পিএম

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমানদের প্রভাব, নেতৃত্ব ও অবদান মূল্যায়নের অংশ হিসেবে জর্ডানভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘দ্য রয়েল ইসলামিক স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার (RISSC)’ প্রতি বছরের মতো এবারও প্রকাশ করেছে দ্য মুসলিম ৫০০: ইনফ্লুয়েনশিয়াল মুসলিমস ২০২৬ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদন।

এ তালিকায় বিশ্বব্যাপী রাজনীতি, সমাজসেবা, শিক্ষা, ধর্মীয় নেতৃত্ব, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারকারী মুসলিম ব্যক্তিত্বদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

২০২৬ সালের জন্য প্রকাশিত এই মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় বাংলাদেশ থেকে স্থান পেয়েছেন তিনজন বিশিষ্ট নাগরিক তাদের মধ্যে একজন মূল শীর্ষ ৫০ প্রভাবশালী মুসলিমের মধ্যে এবং অপর দুইজন সম্মানসূচক ৪৫০ জনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

 শীর্ষ ৫০-এ ড. মুহাম্মদ ইউনূস

বাংলাদেশের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবার স্থান পেয়েছেন মূল তালিকার ৫০তম স্থানে।

তার নেতৃত্ব, দারিদ্র্য বিমোচনে বৈপ্লবিক ভূমিকা, এবং সামাজিক ব্যবসায় ধারণাকে বৈশ্বিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার অবদানকে এই স্বীকৃতির মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

তালিকায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে ড. ইউনূস গণতান্ত্রিক রূপান্তরের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের অঙ্গীকার করেছেন। তিনি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা দেশের রাজনীতিতে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে।

সম্মানসূচক তালিকায় দুই বাংলাদেশি নারী

মূল ৫০ জনের বাইরে প্রকাশিত দ্য ৪৫০ লিস্ট অর্থাৎ সম্মানসূচক তালিকায় আরও দুজন বাংলাদেশি নারী স্থান পেয়েছেন তাদের মানবিক ও সামাজিক অবদানের জন্য।

ড. হামিদা হোসেন

প্রখ্যাত মানবাধিকারকর্মী ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ড. হামিদা হোসেন স্থান পেয়েছেন ‘Social Issues’ বিভাগে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নারীর অধিকার, আইনগত সহায়তা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে আসছেন। প্রতিবেদনে তার অবদানকে দক্ষিণ এশিয়ায় মানবাধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

রাজিয়া সুলতানা

মানবাধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক আইনজীবী রাজিয়া সুলতানা একই বিভাগে স্থান পেয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন এবং রোহিঙ্গা নারীদের ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতার নথিভুক্তিতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন। তিনি বর্তমানে ‘ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনের একজন সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এবারের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি। তিনি ইসলামী ঐক্য, মানবিক সহায়তা ও কূটনীতিতে অবদানের জন্য প্রশংসিত।

দ্বিতীয় স্থানে আছেন পাকিস্তানের বিশিষ্ট ইসলামি আইনবিদ ও বিচারপতি মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি। তিনি ইসলামী অর্থনীতি ও শরিয়াহ আইনের আধুনিক প্রয়োগে বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলেছেন।

তৃতীয় অবস্থানে আছেন ইয়েমেনের সুপরিচিত সুফি আলেম ও দার আল-মুস্তাফা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা শায়খ হাবিব উমর বিন হাফিজ।

তালিকার পরবর্তী অবস্থানগুলোতে রয়েছেন

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি

জর্ডানের রাজা আবদুল্লাহ দ্বিতীয়

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড ইমাম ড. আহমদ আল-তায়্যিব

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান

সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।

 ‘দ্য মুসলিম ৫০০’ প্রতিবেদনটি মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব, প্রভাব ও ইতিবাচক অবদানের বৈশ্বিক মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতিবছর এটি প্রকাশিত হয় আম্মান-ভিত্তিক RISSC কর্তৃক, যা জর্ডানের রাজকীয় আল-বায়ত ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণা প্রকল্প।

প্রতিবেদনটি রাজনৈতিক শক্তি, সামাজিক উদ্যোগ, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়।

২০২৬ সালের তালিকা প্রকাশের পর বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাংলাদেশের তিনজন নাগরিকের অন্তর্ভুক্তি শুধু জাতীয় গৌরব নয়, বরং বৈশ্বিক মানবিক নেতৃত্বে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অবস্থানকেও প্রতিফলিত করে।

বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২০০ কোটিরও বেশি মুসলমান রয়েছে, যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ। ৫৬টি মুসলিমপ্রধান দেশের বাইরে ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ও উপস্থিতি রয়েছে।

গবেষকরা মনে করেন, এই তালিকা শুধু ব্যক্তিগত স্বীকৃতি নয় বরং মুসলিম বিশ্বের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির একটি প্রতিবিম্ব।

বাংলাদেশি তিন ব্যক্তিত্বের এই অর্জন প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবতা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।

ড. ইউনূসের নেতৃত্ব, ড. হামিদা হোসেনের ন্যায়বিচারের আন্দোলন এবং রাজিয়া সুলতানার মানবাধিকার সংগ্রাম এই তিনটি দিকই আধুনিক বিশ্বে ইসলামী মূল্যবোধের বাস্তব প্রয়োগের উদাহরণ।

ইএইচ