আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অন্তর্ভুক্তিমূলকতা কিংবা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে কোনো চাপ নেই বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন।
বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি সমসাময়িক কূটনৈতিক অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মহলে যে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে, পশ্চিমা বিশ্ব অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে কি না সেই প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্টভাবে জানান, সরকার পশ্চিমা দেশগুলোর কোনো চাপ অনুভব করছে না। তারা আগ্রহী এবং নজর রাখছে, কিন্তু কোনো নির্দেশনা বা শর্ত আরোপের প্রশ্নই নেই।
ভারত আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, এটি সম্পূর্ণ নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণ নিয়ে সরকার কোনো বাধা দেবে না। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে ইসি।
তিনি বলেন, পর্যবেক্ষক পাঠানো বা না পাঠানো একটি দেশ–রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে আগ্রহ জানানো হলে নির্বাচন কমিশনই আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেবে।
জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর তাঁকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ জানিয়ে সম্প্রতি দিল্লিকে চিঠি পাঠিয়েছে ঢাকা। এ বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের হাইকমিশনের মাধ্যমে নোট ভারবাল আকারে চিঠি পাঠানো হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত ভারতের পক্ষ থেকে কোনো জবাব আসেনি।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের অনুরোধের ক্ষেত্রে তড়িৎ সাড়া পাওয়া সাধারণত কঠিন। আমরা অপেক্ষা করছি। ভারত কখন উত্তর দেবে, সে বিষয়ে কোনো পূর্বাভাসও দিতে পারছি না।
এছাড়া, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক যে দীর্ঘদিনের এবং দুই দেশের অভ্যন্তরীণ বিচার বিভাজনকে সম্মান জানিয়ে নীতিগত অবস্থান থাকে এই বিষয়গুলোও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ সম্প্রতি যে সম্ভাব্য এয়ারবাস ক্রয়-প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে, তা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক কী প্রভাব ফেলতে পারে এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জানান, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে ইউরোপের কূটনৈতিক সম্পর্কের কোনো নেতিবাচক সংযোগ নেই।
তিনি বলেন, ফ্রান্স থেকে এয়ারবাস কেনা হোক বা না হোক এটি একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনৈতিক অবস্থানের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশ ইইউ সম্পর্ক বর্তমানের মতোই স্বাভাবিক ও দৃঢ় থাকবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের বিমান পরিবহন নীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আধুনিকীকরণের পথে এগোচ্ছে, এবং বিভিন্ন উৎস থেকে বিমান সংযোজনের ক্ষেত্রে সরকার বাজার মূল্য, বহর সামঞ্জস্যতা ও দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা বিবেচনা করছে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ নিয়ে তৌহিদ হোসেন জানান, ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস, লন্ডন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে নিয়মিত কূটনৈতিক আলোচনাই চলছে।
তিনি বলেন, পশ্চিমাদের আগ্রহ থাকতে পারে, আলোচনা হতেই পারে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো চাপ বা বাধ্যবাধকতা নেই। সরকার তার সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনা করবে।
এ সময় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মনে করিয়ে দেন, জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কার প্রক্রিয়া এখনো চলমান, এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এ নিয়ে একটি ন্যূনতম সমঝোতা রয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী সময়েও এই সংস্কার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো সংক্রান্ত চিঠিকে ঘিরে বিভিন্নমুখী আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তৌহিদ হোসেন বলেন, প্রত্যেক দেশের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা এবং অবস্থান থাকে। ভারতের মতো একটি বড় দেশ এ ধরনের অনুরোধ বিবেচনা করতে সময় নেবে এটাই স্বাভাবিক।
তিনি আরও বলেন, এই বিচার এবং রায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ। আন্তর্জাতিক মহলে এ নিয়ে যেসব প্রতিক্রিয়া এসেছে, সেগুলো আমরা কূটনৈতিকভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বারবারই বাংলাদেশের স্বতন্ত্র ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, আমাদের নীতি স্পষ্ট সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বিরোধ নয়। একইসঙ্গে জাতীয় স্বার্থই আমাদের মূল বিবেচনা।
তৌহিদ হোসেন আরও জানান, দেশের নির্বাচন, সংস্কার বা বিচারব্যবস্থা এই সব ক্ষেত্রেই সরকার স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেও বাংলাদেশ নিজের স্বার্থের জায়গায় অবিচল থাকবে এ কথা তিনি পরিষ্কার করেছেন।
জেএইচআর