দেশের কৃষিকে আধুনিক, লাভজনক ও টেকসই পর্যায়ে উন্নীত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারে মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে কার্যকর সরকারি সংস্থাগুলোর একটি হলো এ অধিদপ্তর।
কৃষকের শিক্ষক, পরামর্শদাতা ও সহায়ক হিসেবে কাজ করে প্রতিষ্ঠাটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সরাসরি অবদান রেখে চলেছে।
ডিএই এর মূল দায়িত্ব হলো গবেষণাগার থেকে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও জ্ঞান দ্রুত ও সহজভাবে কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়া, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি কৃষি উপকরণের চাহিদা নিরূপণ, মৌসুমভিত্তিক পরিকল্পনা, সম্প্রসারণ কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারক করে কার্যকারিতা বজায় রাখা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অন্যতম বড় কাজ হলো নতুন কৃষি প্রযুক্তি, আধুনিক চাষাবাদ কৌশল, জলবায়ু সহনশীল জাত, স্মার্ট কৃষি সরঞ্জাম এবং রোগ পোকা ব্যবস্থাপনার সর্বশেষ পদ্ধতি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। দেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যেমন বিএডিসি, বিএআরআই, বিআরআরআই, বিএমইটিসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ উদ্ভাবন মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে ডিএই। ডিজিটাল কৃষি সেবা, বার্তা সংবলিত কৃষি অ্যাপ, অনলাইন তথ্যভান্ডার ও ভিডিওভিত্তিক প্রশিক্ষণকে কৃষকের কাছে সহজলভ্য করে আধুনিক সম্প্রসারণ সেবা এখন আরও কার্যকর হয়েছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে, কমেছে উৎপাদন ব্যয়, আর বেড়েছে কৃষকের লাভজনকতা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেশের খাদ্য উৎপাদন লক্ষ্য অর্জনে বার্ষিক ও মৌসুমভিত্তিক পরিকল্পনা করে থাকে। ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, সবজি, ফল, প্রায় সব ধরনের ফসলেই উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিশেষ সম্প্রসারণ কর্মসূচি নেওয়া হয়। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে কৃষি ব্যবস্থা আধুনিক করার কৌশলও প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়। মাঠ পর্যায়ে কৃষকের জমির ধরন, উপযুক্ত জাত নির্বাচন, সার প্রয়োগের সুষম ব্যবস্থাপনা, সেচ ব্যবস্থার পরিকল্পনা এবং বালাই দমন কৌশলে ডিএই কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর ফলে বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে উঠছে।
কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে গবেষণার ফল দ্রুত সম্প্রসারণ সেবায় যুক্ত করা হচ্ছে। নতুন জাতের ফলনের সম্ভাবনা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, জলবায়ু সহনশীলতা কিংবা ফলনের নিরাপত্তা, এসবই সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। গবেষণা উদ্ভাবন ও মাঠ বাস্তবতার মধ্যকার যোগসূত্র স্থাপনে ডিএই অন্যতম মূল বাহক। খাদ্যশস্য ও কৃষিজাত পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করতে ডিএই নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহ, কীটনাশকের সঠিক প্রয়োগ ও ক্ষতিকর বালাই ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দিয়ে কর্মকর্তারা কৃষকের সচেতনতা বাড়াচ্ছেন। এছাড়া বাজার চাহিদাভিত্তিক ফসল নির্বাচন, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও বিপণনে সহায়তাও সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের নিয়মিত কাজের অংশ।
কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা (এইও) এবং উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (এসএএও) দেশের কৃষি কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সরাসরি কৃষকের পাশে দাঁড়ান। তারা মৌসুমভিত্তিক ফসল উৎপাদন পরিকল্পনা তৈরি, উপকরণ চাহিদা (বীজ, সার, কীটনাশক) নিরূপণ এবং বিভিন্ন সম্প্রসারণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেন।
মাঠপর্যায়ে ফসলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ থেকে শুরু করে ফলাফল মূল্যায়ন পর্যন্ত প্রত্যেক ধাপে তারা সক্রিয় থাকেন। কৃষকের চাষাবাদ সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যায় তাৎক্ষণিক কারিগরি পরামর্শ প্রদান, মাঠ দিবস আয়োজন, কৃষি স্কুল অফ ফার্মারস (এসওএফ), ডেমোনস্ট্রেশন প্লট, কৃষক প্রশিক্ষণ, এসব কার্যক্রম পরিচালনা করেন সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার বিষয়ে কৃষকের সক্ষমতা বৃদ্ধি তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা, চাহিদা যোগান, বালাই পরিস্থিতি, আবহাওয়ার প্রভাব, এসব বিষয়ে নিয়মিত জরিপ পরিচালনা ও তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়। কৃষি পরিকল্পনা প্রণয়নে এসব তথ্য নীতিনির্ধারণী ভূমিকায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এইওরা মাঠপর্যায়ের এসএএওদের কাজ পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করেন। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, এনজিও, কৃষি প্রকল্প ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় বজায় রাখেন। এর ফলে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল ও কার্যকর হয়। কৃষকের চাহিদা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে নতুন প্রকল্প প্রণয়ন, চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ও তদারকি এবং কৃষিনীতির বিভিন্ন সুপারিশ প্রণয়নে সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। নতুন প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, উন্নত জাতের ফল সবজি ও কৃষিবিষয়ক উদ্ভাবন পরিচিত করতে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে কৃষি মেলা আয়োজন করা হয়। এসব আয়োজন কৃষকদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে।
মাঠপর্যায়ের চাষাবাদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষকদের পাশে থেকে ডিএই কর্মকর্তারা শিক্ষক, পরামর্শদাতা ও অভিভাবকের ভূমিকা পালন করছেন। অনেক সময় কৃষকের জমিতে সরেজমিন উপস্থিত থেকে তাৎক্ষণিক পরামর্শ, রোগ পোকা শনাক্তকরণ এবং সুপারিশকৃত প্রতিকার জানিয়ে দেন তারা। এভাবে সরকারি সম্প্রসারণ সেবা এখন সাধারণ কৃষকের আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিনের নেতৃত্বে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নতুন গতিশীলতা পেয়েছে। তার নির্দেশনায় প্রযুক্তিনির্ভর সম্প্রসারণ, তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, মাঠপর্যায়ের হিসাব নিকাশে ডিজিটাল নজরদারি, কৃষক প্রশিক্ষণ জোরদারকরণ এবং উপকরণ চাহিদা নিরূপণে শুদ্ধতা অর্জিত হয়েছে। ডিএই এর কর্মকর্তারা কৃষকের শিক্ষক, এই পরিচয়কে ধারণ করে একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থার বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হয়েছে।
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, আধুনিক কৃষির প্রসার ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভূমিকা অপরিসীম। মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের নিবেদিতপ্রাণ প্রচেষ্টায় কৃষি আজ শুধু জীবিকা নয়, বরং উন্নয়ন ও অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং সমন্বিত উদ্যোগ যদি অব্যাহত থাকে, তবে ভবিষ্যতে কৃষি খাত আরও শক্তিশালী ও টেকসই রূপে গড়ে উঠবে, এমন প্রত্যাশাই কৃষক, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের।