দেশের স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্তচিন্তার ওপর ধারাবাহিক চাপের প্রেক্ষাপটে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গণফোরাম। দলটির নেতারা বলছেন, এই হামলা কেবল দুটি সংবাদমাধ্যমের ওপর নয়, বরং এটি দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনগণের অধিকার আদায়ের কণ্ঠরোধের অপচেষ্টা।
রোববার রাজধানীতে এক প্রতিক্রিয়ায় বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সুব্রত চৌধুরী বলেন, প্রথম আলো অতীতে যেমন জনগণের মুখপত্র হিসেবে কাজ করেছে, তেমনি ভবিষ্যতেও মানুষের অধিকার আদায়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে এটাই জাতির প্রত্যাশা। গণমাধ্যম যখন সত্য তুলে ধরে, তখনই কিছু গোষ্ঠী ক্ষুব্ধ হয়। তিনি বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতাকে দমিয়ে রাখা গেলে সাময়িক সুবিধা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু এতে রাষ্ট্র ও সমাজ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান এই হামলাকে একটি সুপরিকল্পিত হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ঘোষণা দিয়ে শাহবাগ থেকে এসে সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং মুক্তচিন্তা ও স্বাধীন সংবাদপত্রের ওপর সরাসরি আঘাত। তাঁর মতে, এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, ঘটনার শুরু থেকেই সরকারের ভূমিকা ছিল নীরব। তিনি বলেন, এ ধরনের স্পর্শকাতর ঘটনায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু আমরা দেখেছি, শুরুতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। এই নীরবতা দুষ্কৃতকারীদের উৎসাহিত করে। গণফোরাম এই অবস্থানকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করে এর তীব্র নিন্দা জানায়।
সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর হতে পারে না। গণমাধ্যমই সমাজের আয়না যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র উঠে আসে। সেই আয়নায় আঘাত মানেই জনগণের জানার অধিকার ক্ষুণ্ন করা।
গণফোরামের নেতারা মনে করেন, এই হামলার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। মিজানুর রহমান বলেন, আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি অবিলম্বে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু ভিন্নমতের জবাব হামলা দিয়ে দেওয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে সহিংস রাজনীতির সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত হয়, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে।
সুব্রত চৌধুরী বলেন, সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ নতুন নয়, কিন্তু জনগণ অতীতেও দেখেছে চাপ যত বেড়েছে, সত্যের কণ্ঠ তত জোরালো হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই সংকটময় সময়েও প্রথম আলোসহ দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমগুলো মানুষের পাশে থাকবে, জাতিকে আবার জাগ্রত করবে।
গণফোরাম মনে করে, শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিবাদই যথেষ্ট নয়; বরং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম রক্ষায় সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে একযোগে অবস্থান নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা চালানোর সাহস না পায়।
শেষ পর্যন্ত গণফোরামের নেতারা স্পষ্ট করে বলেন, স্বাধীন সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা করা মানেই জনগণের অধিকার রক্ষা করা। এই অধিকার ক্ষুণ্ন হলে রাষ্ট্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়েই সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান করছে।
জেএইচআর