ড. বদিউল আলম

তত্ত্বাবধায়ক সরকারই সুষ্ঠু নির্বাচনের মূল চাবিকাঠি

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১০, ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম

বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য ও অর্থবহ নির্বাচনের জন্য কেবল কারিগরি প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়, বরং একটি নিরপেক্ষ রাজনৈতিক কাঠামো অপরিহার্য।

শনিবার সকালে খুলনায় আয়োজিত এক বিভাগীয় সংলাপে সু শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), এর কেন্দ্রীয় সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া দেশে প্রকৃত অর্থে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়।

খুলনা নগরীর একটি মিলনায়তনে ‘গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার’ শীর্ষক এই সংলাপে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তিনি। সংলাপে খুলনা বিভাগের বিভিন্ন সংসদীয় আসনের প্রার্থী এবং বিশিষ্ট নাগরিকরা অংশগ্রহণ করেন।

ড. বদিউল আলম মজুমদার তার বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে আঙুল তোলেন। তিনি বলেন, আমরা যদি রাষ্ট্রযন্ত্রে সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারি, তবে প্রতি ৫ বছর অন্তর আমাদের সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে রক্ত দিতে হবে। এই যে বারবার আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করতে হয়, এটি আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই ফুটিয়ে তোলে। 

তিনি আরও যোগ করেন, জনগণের সমর্থন বা ম্যান্ডেট ছাড়া ক্ষমতা দখল করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে একটি শক্তিশালী এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের বিকল্প নেই।

সংলাপের মূল প্রতিপাদ্য ছিল সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে রাষ্ট্র সংস্কার। বক্তারা উল্লেখ করেন, ছাত্র জনতার যে আত্মত্যাগ, তার মূল লক্ষ্যই ছিল একটি বৈষম্যহীন এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। ড. মজুমদার বলেন, নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সোপান হতে পারে, কিন্তু এটিই একমাত্র শর্ত নয়। নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করাই আসল চ্যালেঞ্জ।

সংলাপে খুলনা ২ ও খুলনা ৩ আসনের গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীরা তাদের অবস্থান তুলে ধরেন। উপস্থিত ছিলেন খুলনা ২ আসনের বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু, একই আসনের জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল এবং খুলনা ৩ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাহফুজুর রহমান। 

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারনামায় নির্বাচন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ব্যালট ছিনতাই ও কেন্দ্র দখল রোধে প্রযুক্তি ও কঠোর আইনি প্রয়োগ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করাসহ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাজের নিয়মিত হিসাব জনগণের কাছে পেশ করার মতো সংস্কারের ওপর জোর দেন।

সংলাপের সভাপতি ও সুজন খুলনার সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা বলেন, বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের আস্থা তলানিতে। এই আস্থা ফেরাতে হলে কেবল মুখের কথায় কাজ হবে না, মাঠে নিরপেক্ষ পরিবেশের প্রমাণ দিতে হবে। সংলাপে বাসদসহ অন্যান্য প্রগতিশীল দলের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন, যারা রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকে দেশের মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। 

সংলাপে শিক্ষক, আইনজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে বলেন, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় তাদের ইশতেহার ভুলে যায়। এবার যাতে তেমনটি না ঘটে, সে জন্য ভোটারদের সচেতন হওয়ার এবং প্রতিনিধিদের ওপর চাপ প্রয়োগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ড. বদিউল আলম মজুমদারের এই বক্তব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। যখন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের ময়দানে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সুশাসনের এই দাবিগুলো একটি সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ দিচ্ছে। খুলনার এই সংলাপটি মূলত নাগরিকদের প্রত্যাশা এবং প্রার্থীদের অঙ্গীকারের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা করেছে। 

এখন দেখার বিষয়, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই সংস্কারের প্রস্তাবগুলো কতটুকু ঠাঁই দেয় এবং নির্বাচন কমিশন একটি সমতল খেলার মাঠ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে পারে কি না।

জেএইচআর