আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন হতে যাচ্ছে। একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং বহুল প্রতীক্ষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ‘গণভোট’। এই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু শাসকগোষ্ঠীর হাত থেকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে নিতে সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
রোববার সকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ‘নাগরিক পদক-২০২৫’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর একটি মিলনায়তনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘ আলোকপাত করেন।
উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান তার বক্তব্যে আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, সেদিন আপনারা দুটি ভোট দেবেন। একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে গণভোট। এই দ্বিতীয় ভোটটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বাংলাদেশের ক্ষমতার যে চিরাচরিত ধারা বা ‘বাঁক’ আছে, সেটাকে শাসকগোষ্ঠীর থেকে জনগণের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সময়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি নাগরিকরা এই সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে ‘হ্যাঁ’ না বলেন বা নিষ্ক্রিয় থাকেন, তবে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার এই সুবর্ণ সুযোগ আগামী অনেক বছরের জন্য হারিয়ে যেতে পারে। তিনি জনগণকে সরকারের দেওয়া ব্যাখ্যামূলক নোটগুলো পড়ার এবং প্রতিটি সংস্কার প্রস্তাব বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ জানান।
জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা স্মরণ করে রিজওয়ানা হাসান বলেন, অতীতে অনেক আন্দোলন হলেও জুলাই-আগস্টে সফল হওয়ার মূল কারণ ছিল ভয়কে জয় করা। বর্তমানেও ভোটারদের মনে ভীতি সঞ্চারের চেষ্টা করা হচ্ছে এবং কিছু আলামত ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ভয় পেয়ে ঘরে বসে থাকলে স্বৈরাচারের প্রেতাত্মারা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।
তিনি আরও যোগ করেন, ক্ষমতার ভর যদি সত্যিই সাধারণ মানুষের কাছে নিতে চান, তবে আপনাকে ভোটকেন্দ্রে যেতেই হবে। ভয়ভীতি উপেক্ষা করে নিজের মতামত জানানোই হচ্ছে প্রকৃত গণতন্ত্র।
নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের বিশাল ভূমিকার কথা উল্লেখ করে পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, তরুণ সমাজ যেভাবে আমাদের স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্ত করেছে, তাদের মাধ্যমেই গণতন্ত্রের ভিত শক্তিশালী করতে হবে। স্বৈরাচার চলে গেছে মানেই কাজ শেষ নয়, বরং কাজ শুরু। গণতন্ত্র রক্ষায় প্রতিটি নাগরিককে তার ভোটাধিকার প্রয়োগে সর্বোচ্চ সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ‘নাগরিক পদক-২০২৫’ প্রদান করা হয়।
পদকপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে রিজওয়ানা হাসান বলেন, পুরস্কার পাওয়া মানে দায়িত্ব বেড়ে যাওয়া। পদক আপনাকে লাইমলাইটে নিয়ে আসে, ফলে আপনার প্রতিটি কাজ সমাজ আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। এটি কোনো সমাপ্তি নয়, বরং আরও বড় কাজের অনুপ্রেরণা।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। প্রখ্যাত লেখক ও বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান তার বক্তব্যে বলেন, সংস্কার কেবল কাগজে-কলমে থাকলে হবে না, এর সুফল যেন সাধারণ মানুষ পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহমুদুল হাসান। অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ।
ইএইচ