তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটাতে সরকারের পক্ষ থেকে বড় ধরনের সংস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বুধবার কারওয়ান বাজারে আয়োজিত আইসিটি ও টেলিকম খাতের সংস্কারনামা শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব বলেন, আমদানিকৃত মুঠোফোনের ওপর শুল্কভার কমানোর ফলে এখন থেকে বাজারে হ্যান্ডসেটের দাম অনেকটাই কমে আসবে।
গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর কর্তৃক জারিকৃত প্রজ্ঞাপনটি এই খাতের জন্য একটি বিশেষ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন নীতিনির্ধারকেরা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার ফলে হ্যান্ডসেটের দাম কমার ক্ষেত্রে দুটি বড় পরিবর্তন আসবে। প্রিমিয়াম ক্যাটাগরি বা যেসব ফোনের দাম ৩০ হাজার টাকার ওপরে, সেগুলোর প্রতিটিতে আনুমানিক সাড়ে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম কমতে পারে।
অন্যদিকে বাজেট ক্যাটাগরি বা ৩০ হাজার টাকার নিচের ফোনগুলোর অধিকাংশ দেশেই তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে আমদানিকৃত যন্ত্রাংশের শুল্ক সমন্বয়ের ফলে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতিটি ফোনের দাম প্রায় দেড় হাজার টাকা কমবে।
ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব বলেন, আমি এই খাতের একজন অংশীজন হিসেবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে শুল্ক ১০ শতাংশে এনেছি। এটি অন্য যেকোনো খাতের তুলনায় অত্যন্ত সহনশীল একটি পর্যায়।
মুঠোফোনের দাম কমার সুফল সরাসরি গ্রাহকের পকেটে পৌঁছাবে কি না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব জানান, দাম নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআর এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সমন্বিতভাবে কাজ করবে। খুচরা বাজারে কোনো ব্যবসায়ী যাতে কৃত্রিম দাম ধরে রাখতে না পারেন, সেদিকে কড়া নজরদারি রাখা হবে। মুঠোফোন ব্যবসায়ীদের চলমান আন্দোলনের কড়া সমালোচনা করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী।
তিনি জানান, ব্যবসায়ীদের স্টকে থাকা পুরনো ফোনগুলোকে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী তিন মাস কোনো মুঠোফোন ব্লক না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের অধিকাংশ দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের যেসব ফোন কন্টাক্ট বা ক্যারিয়ারের মাধ্যমে বিদেশ থেকে আনা হতো, সেগুলোর ওপর চাপের কথা মাথায় রেখেই শুল্ক প্রায় ৬০ শতাংশ কমানো হয়েছে। এত কিছুর পরও সড়কে আন্দোলন করা দুর্ভাগ্যজনক এবং এটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের পরিপন্থী। আলোচনা সভায় ভয়েস ফর রিফর্ম ও টিআইপিএপি এর আয়োজনে দেশের টেলিকম খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেন বিশেষজ্ঞরা।
বিটিআরসির কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. ইকবাল আহমেদ (অব.) বলেন, প্রযুক্তির সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে হার্ডওয়্যারের দাম কমানোর কোনো বিকল্প নেই।
অন্যদিকে টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মাহতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, কেবল শুল্ক কমানো নয়, টেলিকম সেবার মান এবং ডাটা প্রাইসিং নিয়েও সরকারকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিতে হবে।
আইসিটি বিভাগের শ্বেতপত্র প্রকাশ টাস্কফোর্সের প্রধান অধ্যাপক নিয়াজ আসাদুল্লাহ সভার আলোচনায় উল্লেখ করেন যে, বিগত শাসনামলে এই খাতে যে লুটপাট ও অনিয়ম হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। মুঠোফোন আমদানিতে শুল্ক কমানো সেই সংস্কারেরই একটি অংশ। মুঠোফোন এখন কেবল বিলাসী পণ্য নয়, এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাণিজ্যের অপরিহার্য হাতিয়ার। সরকারের এই শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত ডিজিটাল ডিভাইড বা বৈষম্য কমাতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঘোষিত এই ছাড়ের সুফল যেন সিন্ডিকেটের হাতে না পড়ে সরাসরি সাধারণ ক্রেতার হাতে পৌঁছায়। যদি এনবিআর ও ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর তাদের তদারকি সঠিকভাবে পরিচালনা করে, তবে খুব শীঘ্রই দেশের মানুষ সহনশীল দামে আধুনিক স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
ইএইচ