গুম কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের লোমহর্ষক চিত্র

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০৪:২৫ পিএম

দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে জেঁকে বসা গুম সংস্কৃতির স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। মঙ্গলবার প্রকাশিত ২২৯ পৃষ্ঠার এই দলিলে কেবল পরিসংখ্যান নয়, রয়েছে নির্যাতনের এমন সব বর্ণনা যা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। কমিশনের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল ছিল না, বরং এটি ছিল ভিন্নমত দমনের এক চূড়ান্ত মারণাস্ত্র।

প্রতিবেদনে বিএনপির এক কর্মীর জবানবন্দি তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে তাঁকে আয়নাঘরের মতো গোপন বন্দিশালায় রাখা হয়েছিল। তিনি কমিশনকে জানান, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁর গোপনাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো। শকের তীব্রতায় তিনি বারবার জ্ঞান হারাতেন। যখন জ্ঞান ফিরত, তখন কানে আসত কর্মকর্তাদের ফিসফাস— ‘বেঁচে আছে, বেঁচে আছে...’। এরপর তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করার মতো করে ঝুলিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হতো। অভিযোগ একটাই ছিল— কেন তিনি পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন।

ছাত্রশিবিরের এক কর্মীর বর্ণনাটি আরও শিউরে ওঠার মতো। তিনি জানান, বন্দিশালায় যখনই উচ্চশব্দে গান বা মিউজিক বাজানো হতো, তখনই বন্দিরা বুঝে নিতেন পাশের ‘টর্চার রুমে’ কাউকে নির্যাতন করা হচ্ছে। চিৎকারের শব্দ চাপা দেওয়ার জন্যই এই মিউজিক বাজানো হতো। নির্যাতনের শিকার সেই ছাত্র জানান, টানা দুই মাস তাঁর চোখ বেঁধে রাখা হয়েছিল। চোখের ব্যথায় মনে হতো সবকিছু ছিঁড়ে যাচ্ছে। মুক্তির পর অপারেশনের মাধ্যমে দেখা যায় তাঁর চোখের রেটিনা ছিঁড়ে গেছে। নির্যাতনের সেই আতঙ্কে বন্দিশালায় তাঁর স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কাজও রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।

কমিশন গুমের শিকার এক ছাত্রীর জবানবন্দি উল্লেখ করেছে, যা রাষ্ট্রের চরম নৈতিক স্খলনের প্রমাণ দেয়। ওই ছাত্রীর ওড়না কেড়ে নিয়ে দুই হাত দুই দিকে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। জানালা দিয়ে পুরুষ কর্মকর্তারা এসে তাঁকে দেখে হাসাহাসি ও টিটকারি করতেন। পিরিয়ড চলাকালীন স্যানিটারি প্যাড চাইলে কর্মকর্তারা তা নিয়ে উপহাস করত। পর্দানশীল পরিবারের মেয়ে হওয়ায় তাঁকে বারবার হেয়প্রতিপন্ন করা হতো এবং বলা হতো, "এখন সব পর্দা ছুটে গেছে।"

প্রতিবেদনে গুমের দায়ভার সরাসরি তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের ওপর বর্তানো হয়েছে। কমিশন তথ্যপ্রমাণসহ জানিয়েছে যে, হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনাগুলোতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (যিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত), তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি জড়িত ছিলেন।

প্রতিবেদনে ডিজিএফআই, এনএসআই এবং র‍্যাবে কর্মরত বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তাদের অপরাধের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। কমিশন উল্লেখ করেছে যে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ ছাড়া এই ধরনের সংগঠিত অপরাধ সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়।

তদন্ত কমিশন মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনা গুম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। কমিশনের উল্লেখযোগ্য তথ্যের মধ্যে রয়েছে:

মিসিং অ্যান্ড ডেড: ২৮৭টি অভিযোগ এই ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত।
জিজ্ঞাসাবাদ: কমিশন সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি এবং কোস্টগার্ডের মোট ২২২ জন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
সাক্ষাৎকার: ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারসহ মোট ৭৬৫ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

গুম হওয়া ব্যক্তিদের একাংশকে সীমান্ত পার করে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগটিও খতিয়ে দেখেছে কমিশন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতীয় কারাগারের একটি তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছিল, যেখানে প্রায় ৪ হাজার ৩৩৭ জন বাংলাদেশির নাম পাওয়া গেছে। তবে নিখোঁজ হওয়া বা গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম ভারতের দেওয়া সেই তালিকায় পাওয়া যায়নি। এছাড়া বিএসএফ কর্তৃক পুশব্যাক হওয়া ব্যক্তিদের তালিকাও পর্যালোচনা করেছে কমিশন।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে ৫ সদস্যের এই কমিশন গঠিত হয়। কমিশন গুমের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার এবং দায়ীদের চিহ্নিত করার লক্ষ্যে এই প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

গুম কমিশনের এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক নতুন বাঁক। এটি কেবল অভিযোগের স্তূপ নয়, বরং প্রতিটি ভুক্তভোগীর কান্নার প্রতিধ্বনি। সরকার এই প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে সত্য শিকার করে নিয়েছে, এখন দেখার বিষয়—আয়নাঘরের কারিগরদের দেশের প্রচলিত আইনে কত দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হয়। নিখোঁজ হওয়া অন্তত ২৫১ জন ব্যক্তি আজও কোথায় আছেন, সেই উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো জাতি।

এএন