দেশের অর্থনীতির বর্তমান সংকট, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য এবং সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার পেছনে বিগত সরকারের নেওয়া মেগাপ্রকল্পগুলোকে সরাসরি দায়ী করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। বিশেষ করে পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল এবং পায়রা বন্দরের মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোকে তিনি অযাচিত এবং অপরিণামদর্শী বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এসব প্রকল্পের কারণে সৃষ্ট বিশাল ঋণের বোঝা এবং টাকার মান কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে চালসহ নিত্যপণ্যের বাজারে।
রোববার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আসন্ন রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনাবিষয়ক টাস্কফোর্সের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি নেত্রকোনায় এক অনুষ্ঠানে তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, পদ্মা সেতুর কারণে চালের দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়েছে। রোববারের সংবাদ সম্মেলনে সেই মন্তব্যেরই বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরেন উপদেষ্টা।
সাধারণত অবকাঠামো উন্নয়নের সাথে পণ্যের দাম কমার একটি সম্পর্ক থাকে, কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে পরিবহন খরচ কমে। কিন্তু বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, বিষয়টি কেবল টোল বা পরিবহন খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সামষ্টিক অর্থনীতির বা ম্যাক্রো ইকোনমিকসের গভীর ক্ষতের ফল। উপদেষ্টা বলেন, বিগত ১৫ বছরে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ, আমাদের টাকার মান কমে প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। যখন একটি দেশের মুদ্রার মান এতটা কমে যায়, তখন আমদানি করা প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়ে যায়। আর চালের উৎপাদন খরচ, সার, সেচ বা পরিবহনে ব্যবহৃত জ্বালানি, সবকিছুর সাথেই আন্তর্জাতিক বাজার এবং ডলারের সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই বিশাল অবমূল্যায়নের মূল কারণ হলো অপরিকল্পিত সরকারি ব্যয় এবং ঋণের পাহাড়। সরকার যখন আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করে এবং সেই ব্যয় যদি কোনো কার্যকর আয় বা রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট তৈরি করতে না পারে, তখন অর্থনীতিতে ধস নামে। যার ফলে আইএমএফের মতো সংস্থার কাছ থেকে কঠিন শর্তে ঋণ নিতে হয়েছে, আর সেই ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের কাঁধেই এসে পড়েছে নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম হিসেবে।
সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০০৮ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র দুই লাখ কোটি টাকা। কিন্তু সরকার চলে যাওয়ার সময় সেই ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। এই বিশাল অংকের ঋণ দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। ঋণভিত্তিক উন্নয়নের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ঋণ নেওয়া দোষের নয়, যদি তা আয়বর্ধক খাতে বিনিয়োগ করা হয়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটেছে। দরকার ছিল ব্যয়ের চেয়ে আয়ের উদ্বৃত্ত তৈরি করা, যা ঋণ পরিশোধে সহায়তা করত। কিন্তু ঋণভিত্তিক ব্যয় কোনো আয় তৈরি করতে পারেনি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি দায় তৈরি হয়েছে, যা এখন সাধারণ মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে। তিনি পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল এবং পায়রা বন্দরকে অযাচিত প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার মতে, এসব প্রকল্প নেওয়ার আগে এর অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সঠিকভাবে যাচাই করা হয়নি অথবা রাজনৈতিক চমক দেখানোর জন্য বাড়িয়ে বলা হয়েছে। নিজের বক্তব্যের সপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা পদ্মা রেলসেতু প্রকল্পের একটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ টানেন, যা উপস্থিত সাংবাদিকদের এবং অর্থনীতিবিদদের ভাবিয়ে তোলে।
শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, পদ্মা রেলসেতু প্রকল্প যখন নেওয়া হয়, তখন বলা হয়েছিল এই খাত থেকে বছরে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা আয় হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আয় হয়েছে মাত্র ২৬ কোটি টাকা। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি প্রমাণ করে যে প্রকল্পগুলো কতটা অপরিকল্পিত ছিল। তিনি আরও যোগ করেন, বলা হয়েছিল পদ্মা সেতু চালু হলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে কী দেখলাম? প্রবৃদ্ধি বাড়েনি, উল্টো কমেছে। অর্থনীতির এই সূচকগুলো মিথ্যা বলে না।
উপদেষ্টার মতে, এই বিশাল অংকের টাকা যদি কংক্রিটের কাঠামোতে আটকে না রেখে কৃষি খাতে বিনিয়োগ করা হতো, তবে আজ চালের বাজার এতটা অস্থির হতো না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এই বিপুল অর্থ যদি আমরা সেচ ও সারে ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় করতে পারতাম এবং ব্যয় যদি প্রয়োজন অনুযায়ী হতো, তাহলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমত। ফলে চালের দাম কমত, ঋণ কমত এবং আমাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও বাড়ত।
মেগাপ্রকল্পের সমালোচনার পাশাপাশি আসন্ন রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আশার বাণীও শুনিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা। টাস্কফোর্সের বৈঠকের পর তিনি জানান, বিগত বছরের তুলনায় এবার নিত্যপণ্যের আমদানির পরিস্থিতি অনেক ভালো। শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, আমরা বৈঠকের মাধ্যমে বর্তমান বাজারের স্থিতি নিয়েছি। উৎপাদন ও আমদানির পরিমাণগত বিশ্লেষণ করে দেখেছি, গত বছরের তুলনায় এবার নিত্যপণ্যের আমদানি ৪০ শতাংশের বেশি হয়েছে। এটি একটি বড় ইতিবাচক দিক।
রমজানে পণ্যের দাম বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, আসন্ন রমজানে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। উৎপাদন ও আমদানি সরবরাহ চেইনকে শক্তিশালী করেছে। সামগ্রিক বিবেচনায় বাজার পরিস্থিতি বরং নিম্নগামী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাজার স্থিতিশীল থাকার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেন উপদেষ্টা। এর মধ্যে রয়েছে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা যাতে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে না, ডলারের বিপরীতে টাকার মান আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে এবং এলসি বা লেটার অব ক্রেডিট খোলার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা এখন আর ডলার সংকটে পড়ছেন না।
সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, সরবরাহ পরিস্থিতি কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে গত বছরের মতোই আছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা কম থাকলেও আমদানির পাইপলাইনে থাকা পণ্য এলে ঘাটতি থাকবে না। আমরা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছি। আসন্ন রমজানে পরিস্থিতি ভালো থাকবে বলে আশা করছি।
বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন এ এইচ এম আহসান এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরাও সরকারকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ব্যবসায়ীরা জানান, ডলারের দর স্থিতিশীল থাকায় এবার আমদানি করা পণ্যের দাম খুব একটা ওঠানামা করার কথা নয়। তবে পরিবহন ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে মন্ত্রীদের জন্য বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণের কথিত উদ্যোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। দেশের এমন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। জবাবে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, সরকার এ ধরনের কোনো প্রকল্প নিয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই। তবে বর্তমান সরকার কৃচ্ছ্রসাধনে বিশ্বাসী এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর নীতিতে অটল।
রোববারের এই সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা মূলত দেশের অর্থনীতির গতিপথ নিয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। বিগত দেড় দশকের উন্নয়ন দর্শন, যেখানে দৃশ্যমান অবকাঠামোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল, তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি কৃষি, উৎপাদন এবং টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর জোর দিয়েছেন। তার বক্তব্যের সারমর্ম হলো, মেগাপ্রকল্পের চাকচিক্য সাময়িকভাবে চোখ ধাঁধিয়ে দিলেও, তার পেছনে থাকা ঋণের অন্ধকার দিকটি সাধারণ মানুষের পকেটে হাত ঢুকিয়েছে। পদ্মা সেতুর টোল বা রেললাইনের স্লিপার হয়তো দৃশ্যমান, কিন্তু এর পেছনের হাজার কোটি টাকার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে যে ডলার সংকট তৈরি হয়েছে, তার মাসুল দিতে হচ্ছে চালের বাজারে বাড়তি দাম দিয়ে।
উপদেষ্টার এই বিশ্লেষণ হয়তো রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেবে, কিন্তু অর্থনীতির সাধারণ সূত্র অনুযায়ী ঋণের টাকায় ঘি খাওয়ার পরিণাম যে শেষ পর্যন্ত শুভ হয় না, চালের বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার এখন সেই অপরিণামদর্শী ব্যয়ের ক্ষত সারিয়ে অর্থনীতিকে কতটা স্থিতিশীল করতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।