বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের পরিচিত মুখ আনিস আলমগীরের আইনি সংকট আরও ঘনীভূত হলো। গত ডিসেম্বর থেকে কারাগারে থাকা এই সিনিয়র সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এবার দুর্নীতির অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতের টেবিলে উঠল। অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় তাকে নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানোর (Show Arrest) আদেশ দিয়েছেন আদালত।
বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত এই সিদ্ধান্ত দেন। এই আদেশের ফলে আনিস আলমগীরের মুক্তি লাভের পথ যেমন দীর্ঘায়িত হলো, তেমনি তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তালিকায় যুক্ত হলো গুরুতর অর্থনৈতিক অপরাধের তকমা।
বুধবার সকালে ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজের আদালতে আনিস আলমগীরকে হাজির করা না হলেও নথিপত্রের ভিত্তিতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গত ১৫ জানুয়ারি দুদকের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সেই মামলার ধারাবাহিকতায় গত ২৫ জানুয়ারি তদন্তকারী কর্মকর্তা ও দুদকের সহকারী পরিচালক আখতারুজ্জামান তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য আবেদন জানান। শুনানি শেষে আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেন।
দুদকের দায়ের করা মামলার এজাহারে আনিস আলমগীরের সম্পদের একটি বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে যে, দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা পেশার আড়ালে তিনি তার আয়ের উৎসের সাথে সংগতিহীন বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। দুদকের অনুসন্ধান দল প্রাথমিক তদন্তে তার নামে নিম্নোক্ত সম্পদের তথ্য পেয়েছে:
স্থাবর সম্পদ: ২৫ লাখ টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ (জমি বা ফ্ল্যাট সংক্রান্ত)।
অস্থাবর সম্পদ: ৩ কোটি ৮৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮৯ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদ (ব্যাংক ব্যালেন্স, শেয়ার বা অন্যান্য বিনিয়োগ)।
মোট পরিমাণ: মোট ৪ কোটি ৯ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮৯ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য দুদকের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের দাবি, এই সম্পদের বড় একটি অংশের বৈধ কোনো উৎস আনিস আলমগীর প্রদর্শন করতে পারেননি, যা মূলত ‘মানিলন্ডারিং’ বা অর্থপাচারের শামিল।
আনিস আলমগীরের এই আইনি সংকটের সূত্রপাত ঘটে গত বছরের শেষ দিকে। ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তুলে নিয়ে যায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়ার গুঞ্জন থাকলেও পরে তাকে একটি ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনের’ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
১৫ ডিসেম্বর তাকে আদালতে হাজির করা হলে রাষ্ট্রপক্ষ রিমান্ডের আবেদন করে। অন্যদিকে বিবাদী পক্ষ থেকে জামিনের জোর দাবি জানানো হলেও আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাকে ৫ দিনের পুলিশি রিমান্ডে পাঠান। ২০ ডিসেম্বর রিমান্ড শেষে তাকে পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয় এবং সেই থেকে তিনি কারান্তরীণ রয়েছেন।
আনিস আলমগীরের আইনজীবীদের মতে, তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। প্রথমে তাকে রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এখন সেই মামলায় জামিন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে না হতেই দুদককে ব্যবহার করে নতুন মামলা সাজানো হয়েছে।
তবে প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, কোনো পেশাজীবীই আইনের ঊর্ধ্বে নন। যদি কোনো সাংবাদিক তার পেশাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েন, তবে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। দুদকের এই মামলাটি দীর্ঘ অনুসন্ধানের ফসল বলেই তাদের দাবি।
আনিস আলমগীরের এই গ্রেপ্তার এবং পরবর্তী দুর্নীতি মামলা দেশের গণমাধ্যম মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। একদিকে যেমন তার মুক্তি ও ন্যায়বিচারের দাবি উঠছে, অন্যদিকে বিপুল অংকের অবৈধ সম্পদের অভিযোগ সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। সাংবাদিকতা পেশার আড়ালে প্রভাবশালী মহলের সাথে সখ্যতা বা অন্য কোনো মাধ্যমে এই সম্পদ অর্জিত হয়েছে কি না, তা এখন তদন্তের বিষয়।
দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পর এখন আনিস আলমগীরকে এই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করতে পারে কমিশন। বর্তমানে তিনি কারাগারে থাকায় আইনি প্রক্রিয়াগুলো জেল কোড অনুযায়ী পরিচালিত হবে। তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা উচ্চ আদালতে জামিনের জন্য আবেদন করবেন এবং সম্পদের যে হিসাব দুদক দিয়েছে, তার আইনি ব্যাখ্যা দেবেন।
আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে আনা ৪ কোটি টাকারও বেশি সম্পদের অভিযোগ যদি প্রমাণিত হয়, তবে তার ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত জীবনে এটি একটি বড় ধাক্কা হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন, তবে রাষ্ট্রযন্ত্রের এই হয়রানি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হবে। আপাতত দেশবাসী ও সাংবাদিক সমাজ তাকিয়ে আছে আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। ক্ষমতার পালাবদল বা রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে একজন সিনিয়র সাংবাদিকের এই দীর্ঘ কারাবাস ও নতুন নতুন মামলায় জড়িয়ে পড়া বাংলাদেশের বর্তমান বিচারিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিরই একটি অংশ কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে জোরালোভাবে।
এএন