এক নতুন ভোরের সূর্যোদয়ের সাক্ষী হলো আজ বাংলাদেশ। যে সূর্য কেবল পুব আকাশে নয়, বরং কোটি মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি হয়ে দেখা দিয়েছে। ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক ১২ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজধানী ঢাকার গুলশান মডেল হাইস্কুল ও কলেজ কেন্দ্রে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ভোটদান শেষে সাংবাদিকদের সামনে দেওয়া তাঁর সংক্ষিপ্ত কিন্তু সুগভীর বক্তব্যে উঠে এসেছে এক নতুন উৎসবের বারতা।
ভোটকেন্দ্র থেকে বের হয়ে হাস্যোজ্জ্বল মুখে ড. মুহাম্মদ ইউনূস দিনটিকে বর্ণনা করেন এক অভূতপূর্ব উৎসব হিসেবে। তিনি বলেন, আজ মহা আনন্দের দিন, এক নতুন উৎসবের সূচনা হলো আজ। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর আত্মত্যাগের পর দেশের সাধারণ মানুষ যখন সরাসরি রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে নিজেদের মতামত দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, সেই মুহূর্তটিকে তিনি কেবল একটি নির্বাচন বা ভোট হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন জনমানুষের মুক্তির উৎসব হিসেবে। প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, আজ নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন। সারা দেশজুড়ে আজ এই জন্মোৎসব পালন করা হবে। তাঁর এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, গণভোটের এই দিনটিকে তিনি রাষ্ট্রের এক নতুন সূচনালগ্ন বা পুনর্জন্ম হিসেবে গণ্য করছেন।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার করে আসছিল। আজকের এই গণভোট সেই সংস্কার প্রক্রিয়ারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অধ্যাপক ইউনূস দৃঢ়তার সাথে জানান, এই গণভোটের মাধ্যমেই বাংলাদেশের চলমান সংস্কার কার্যক্রম আরও গতিশীল ও বৈধতা পাবে। জনমতের প্রতিফলন ঘটলে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন, গণতান্ত্রিকভাবে আরও শক্তিশালী হবে। তিনি দেশের প্রতিটি নাগরিককে এই উৎসবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, প্রতিটি ভোটই হবে আগামীর সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার একেকটি শক্ত ভিত।
সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রধান উপদেষ্টা একটি তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি পদে আজ নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এটি কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়, বরং সামাজিক ও প্রশাসনিক স্তরেও যে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটছে, ড. ইউনূস সেটিই মনে করিয়ে দিলেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সততা নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য তিনি শুরু করেছেন, এই গণভোট তাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সকাল থেকেই গুলশান মডেল হাইস্কুল ও কলেজ কেন্দ্রসহ সারা দেশের কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তরুণ থেকে বৃদ্ধ, সবাই ভোট দিতে এসেছেন। ড. ইউনূস যখন ভোটকেন্দ্রে পৌঁছান, তখন সেখানে উপস্থিত ভোটারদের মধ্যেও এক ধরনের উচ্ছ্বাস দেখা যায়। প্রধান উপদেষ্টা নিজেও সাধারণ প্রক্রিয়ায় ভোট দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, নতুন বাংলাদেশে অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সংস্কৃতির চেয়ে নাগরিক অধিকারই বড়। তাঁর এই বিনয়ী উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মনে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আজকের এই বক্তব্য এবং ভোট প্রদান অনুষ্ঠানটি কেবল একটি সংবাদ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। তিনি যেভাবে দিনটিকে জন্মদিন হিসেবে ঘোষণা করেছেন, তাতে এটি পরিষ্কার যে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে খোদাই করা থাকবে। জাতি এখন প্রতীক্ষায় আছে গণভোটের ফলাফলের, যা নির্ধারণ করবে আগামীর এক আধুনিক, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথচলা।
জেএইচআর