ব্যালট বিপ্লবের মাঝেও নারী নেতৃত্বে ভাটা: ২৫ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন নারী প্রতিনিধি

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০২:১০ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বড় বড় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও নারী নেতৃত্বের অগ্রযাত্রায় বড় ধরনের ধীরগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসছেন মাত্র ৭ জন নারী প্রতিনিধি, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। 

সর্বশেষ ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনেও ঠিক এই সংখ্যক নারী সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। দেশে ক্ষমতার পালাবদল এবং রাষ্ট্র সংস্কারের নতুন জোয়ার বইলেও জাতীয় সংসদে নারী নেতৃত্বের সরাসরি অংশগ্রহণ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০১ সালের পর এটিই সরাসরি ভোটে নারীদের সবচেয়ে কম প্রতিনিধিত্ব।

নির্বাচিত এই ৭ জনের মধ্যে ৬ জনই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি থেকে জয়ী হয়েছেন এবং একজন জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। বড় দলগুলোর পক্ষ থেকে নারীদের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই পুরনো অনাগ্রহ এবং নির্বাচনের মাঠে নারীবিদ্বেষী অপপ্রচারকেই এই ধসের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। 

প্রতিবন্ধকতা জয় করে যে সাতজন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে যাত্রা শুরু করছেন তাঁরা হলেন মানিকগঞ্জ-৩ আসন থেকে আফরোজা খানম, ঝালকাঠি-২ আসন থেকে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, সিলেট-২ আসন থেকে তাহসিনা রুশদীর, নাটোর-১ আসন থেকে ফারজানা শারমিন, ফরিদপুর-২ আসন থেকে শামা ওবায়েদ ইসলাম, ফরিদপুর-৩ আসন থেকে নায়াব ইউসুফ আহমেদ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। উল্লেখ্য, রুমিন ফারহানা বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হিসেবে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন।

জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে প্রতিটি দল অন্তত ৫ শতাংশ নারী মনোনয়ন নিশ্চিত করবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটেনি। এবার মোট প্রার্থীর মধ্যে নারীর তুলনায় পুরুষরা মনোনয়ন পেয়েছেন ২২ গুণ বেশি। নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য মীর নাদিয়া নিভিনের মতে, নারীরা খারাপ করেছেন তা বলা যাবে না, বরং তাঁদের সুযোগই দেওয়া হয়েছে কম। 

তিনি জানান, পুরুষ প্রার্থীদের জয়ের হার ১৫ শতাংশ হলেও নারী প্রার্থীদের জয়ের হার ৮ শতাংশের বেশি। যদি আরও বেশি নারীকে মনোনয়ন দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া হতো, তবে এই চিত্র ভিন্ন হতে পারত।

নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারী প্রার্থীদের মতে, এবারের নির্বাচনের পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে নারীবিদ্বেষী ছিল। ফরিদপুর-৩ আসন থেকে জয়ী নায়াব ইউসুফ আহমেদ বলেন, সমাজে নারীদের এখনো বৈষম্যের চোখে দেখা হয়। তাঁকে দুর্বল ভেবে অনেকে কোণঠাসা করতে চেয়েছিল কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছেন কাজ দিয়ে। 

অন্যদিকে ঢাকা-১২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা গণসংহতি আন্দোলনের তাসলিমা আখতার মনে করেন, একটি বিশেষ গোষ্ঠীর নারীবিদ্বেষী প্রচারণা নারীদের নাগরিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করেছে। নারীরা রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবে না বা নারীদের নেতৃত্বে আনা যাবে না এমন প্রচারণাও জনমতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে তাঁর ধারণা।

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে নারী সদস্যদের সংখ্যার ওঠানামা লক্ষ্য করার মতো। প্রথম সংসদে ১৯৭৩ সালে কোনো নারী নির্বাচিত হননি, যদিও ১৫টি সংরক্ষিত আসন ছিল। চতুর্থ সংসদে ৪ জন, সপ্তম সংসদে ৮ জন এবং অষ্টম সংসদে ৭ জন নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নবম সংসদে সর্বোচ্চ ২১ জন নারী সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সংরক্ষিত ৫০টি আসন যুক্ত হলে এবারের সংসদে মোট নারী সদস্যের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৭। এতে ৩৫০ আসনের সংসদে নারীর মোট প্রতিনিধিত্ব হবে মাত্র ১৬ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল নির্বাচনের সময় মনোনয়ন দিয়ে নারী নেতৃত্ব বাড়ানো সম্ভব নয়। তৃণমূল পর্যায় থেকে নারীদের রাজনৈতিকভাবে দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে নারী নেতৃত্ব বিকাশের পরিবেশ তৈরি না করলে জাতীয় সংসদে এই লিঙ্গ বৈষম্য দূর করা কঠিন হবে। নতুন সংসদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই স্বল্প সংখ্যক নারী সদস্য নিয়ে কীভাবে নারী অধিকার ও জেন্ডার সমতার বিষয়গুলোকে জোরালোভাবে তুলে ধরা যায়।

জেএইচআর