বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে যুক্ত হতে যাচ্ছে এক অনন্য অধ্যায়। দীর্ঘ সময় পর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানকে ঘিরে উৎসবের আমেজ এখন গোটা রাজধানীতে।
তবে এবারের আয়োজনে রয়েছে বড় ধরনের চমক। বঙ্গভবনের চার দেয়াল থেকে বেরিয়ে এসে শপথ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে লুই আই কানের স্থাপত্যশৈলী খ্যাত জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়।
মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রিসভাকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এই আয়োজনকে ঘিরে সংসদ ভবন ও এর আশপাশের এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে এক অভেদ্য নিরাপত্তা বলয়।
সাধারণত নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বঙ্গভবনের দরবার হলে অনুষ্ঠিত হলেও এবার দক্ষিণ প্লাজাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি জনগণের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে উন্মুক্ত পরিসরে আয়োজন করা হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং সংসদ সচিবালয় যৌথভাবে এই সুবিশাল আয়োজন সম্পন্ন করেছে। দক্ষিণ প্লাজায় তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন মঞ্চ এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য বিশেষ প্যান্ডেল।
প্রধানমন্ত্রীর শপথের কয়েক ঘণ্টা আগে, অর্থাৎ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় শপথ নেবেন নবনির্বাচিত ২৯৭ জন সংসদ সদস্য। সংবিধানের বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতির কারণে এবার এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা যাবে।
সংবিধান অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। সংসদ সচিবালয় ইতোমধ্যে সংসদ সদস্যদের জন্য ডিজিটাল কার্ড ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রেখেছে।
বিএনপির এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনকে গুরুত্ব দিয়ে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ভারত ও পাকিস্তান, দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাই এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সম্মতি জানিয়েছেন।
এ ছাড়াও নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, শপথ অনুষ্ঠানে প্রতিবেশী দেশগুলোর এই অংশগ্রহণ নতুন সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক কূটনৈতিক সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের প্রটোকল ও চলাচলের সুবিধার্থে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে চালকসহ ৫০টি নতুন এবং সংস্কারকৃত গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
শপথ নেওয়ার পরপরই মন্ত্রীরা এই গাড়িগুলোতে করে তাঁদের গন্তব্যে রওনা হতে পারবেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, গাড়ির পাশাপাশি মন্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত সরকারি বাসভবনগুলোও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়েছে।
শপথ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর ও সংসদ ভবন এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী, পুলিশ, র্যাব এবং সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
পুরো সংসদ এলাকা ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি করা হচ্ছে এবং ৫ শতাধিক অতিরিক্ত ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর থেকে সংসদ ভবনের চারপাশের রাস্তাগুলোতে সাধারণ যানবাহন চলাচল সীমিত রাখা হবে। কেবল কার্ডধারী অতিথিদের গাড়ি প্রবেশ করতে পারবে।
দীর্ঘ ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক পথে ফেরার এই মাহেন্দ্রক্ষণ নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝেও ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দক্ষিণ প্লাজার খোলা আকাশের নিচে নতুন প্রধানমন্ত্রী যখন শপথ নেবেন, তখন তা কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের এক নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে।
জেএইচআর