এক ইঞ্চি মাটি কাটলেও কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি মন্ত্রী ইয়াছিনের

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬, ০৩:০৭ পিএম

কুমিল্লার দুঃখ ও সুখের আধার হিসেবে পরিচিত গোমতী নদীর অস্তিত্ব রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে নবনির্বাচিত সরকার। গোমতীর চরাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটা বন্ধে জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীলতা নীতি ঘোষণা করেছেন কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন। 

শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লা সার্কিট হাউসে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় তিনি এই কড়া বার্তা দেন।

দীর্ঘদিন ধরে গোমতী নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ এবং চরাঞ্চলের উর্বর মাটি মাফিয়াদের কবলে থাকায় স্থানীয় পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে মন্ত্রী ইয়াছিন উল্লেখ করেন, আজ থেকে গোমতীর এক ইঞ্চি মাটিও কাউকে কাটতে দেওয়া হবে না। 

যারা এতদিন ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বা প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে নদীর বুক খালি করেছে, তাদের দিন শেষ। পরিবেশ ও নদী রক্ষায় আমরা কোনো আপস করব না। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, রাত, দিন ২৪ ঘণ্টা তদারকি বাড়াতে হবে এবং নদী রক্ষায় কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা তদবির সহ্য করা হবে না।

কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই মন্ত্রী মাটি কাটার নেতিবাচক প্রভাব কেবল পরিবেশের ওপর নয়, বরং সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর পড়ছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, কৃষি জমিতে ক্রমাগত রাসায়নিকের ব্যবহার এবং মাটির উপরিভাগ বা টপ সয়েল কেটে নেওয়ার ফলে জমিতে হেভি মেটাল বা ভারী ধাতুর মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। 

মন্ত্রী বলেন, জমির উর্বরতা কমে যাওয়ায় আমাদের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যা সমাধানে সরকার একটি সুদূরপ্রসারী ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা খুব শীঘ্রই মাঠ পর্যায়ে কার্যকর করা হবে।

মতবিনিময় সভায় কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান এবং পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামানকে মন্ত্রীর এই নির্দেশ অবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য রূপরেখা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে আসা মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রউফ এবং প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. আবু সুফিয়ান তাঁদের নিজ নিজ বিভাগের পক্ষ থেকে নদী তীরবর্তী মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন। 

সভায় জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী নির্দেশ দেন যে, কেবল জরিমানা নয়, নদী ও মাটি খেকোদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা এবং প্রয়োজনে জেল হাজত নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষি ও খাদ্যমন্ত্রী নদী রক্ষায় গোমতী নদীর চরাঞ্চল থেকে মাটি কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছেন এবং কৃষি জমিতে ভারী ধাতুর ঝুঁকি কমাতে বিশেষ প্রকল্পের কথা জানিয়েছেন। মাটির উপরিভাগ রক্ষা ও জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং নিশ্চিত করতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের নির্দেশ দেন তিনি। এছাড়া কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের মধ্যে নিবিড় সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

কুমিল্লার প্রাণ হিসেবে পরিচিত গোমতী নদী থেকে বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে মাটি কেটে ইটভাটায় সরবরাহ করা হয়েছে। এর ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তনসহ বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। মন্ত্রী হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন কুমিল্লারই সন্তান হওয়ায় এই সমস্যার গভীরতা তিনি উপলব্ধি করেছেন। তাঁর এই ঘোষণা কুমিল্লার সাধারণ মানুষ এবং নদী রক্ষা আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি সত্যিই এক ইঞ্চি মাটিও কাটতে না দেওয়ার এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়, তবে গোমতী তার হারানো যৌবন ফিরে পাবে এবং কুমিল্লার কৃষি অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে।

বক্তব্য থেকে বাস্তবে এই ঘোষণার প্রতিফলন দেখতে মুখিয়ে আছেন কুমিল্লার ১০ লাখেরও বেশি কৃষক। মন্ত্রী ইয়াছিন তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান সরকার কেবল স্লোগানে নয়, বরং কাজের মাধ্যমে জনগণের খাদ্য ও পরিবেশের অধিকার ফিরিয়ে দিতে চায়। এখন দেখার বিষয়, স্থানীয় প্রশাসন কত দ্রুত মাটি খেকো সিন্ডিকেটকে হটিয়ে গোমতীকে মুক্ত করতে পারে।

জেএইচআর