বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ লগ্নে, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ৭২ ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি গোপন বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে দেশে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
একজন গবেষকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই চুক্তির প্রতিটি পরতে বাংলাদেশের অর্থনীতির সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার এবং মার্কিন বাণিজ্যিক স্বার্থের কাছে আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত রয়েছে।
আপাতদৃষ্টিতে শুল্ক হ্রাসের কথা বলা হলেও, এর আড়ালে কৃষি, শিল্প এবং ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এক অসম লড়াইয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে। চুক্তির অন্যতম প্রচার করা দিক হলো বাংলাদেশি পণ্যে পাল্টা শুল্ক ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ বলছে ভিন্ন কথা।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য প্রবেশের সাধারণ শুল্ক সাড়ে ১৫ শতাংশ। এর সঙ্গে ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক যোগ করলে মোট শুল্ক দাঁড়ায় ৩৪.৫ শতাংশ। তুলা বা সুতা ব্যবহারের মাধ্যমে যে ছাড়ের কথা বলা হচ্ছে, তা নানা জটিল শর্তে আবদ্ধ। এটি বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য সুবিধা আদায়ের চেয়ে চ্যালেঞ্জই বেশি তৈরি করবে।
চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬,৭১০টি পণ্যে বিশাল শুল্ক ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিনিময়ে বাংলাদেশ সুবিধা পাবে মাত্র ১,৬৩৮টি পণ্যে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ৪,৫০০টি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। এর মধ্যে গবাদিপশু, মাছ, মাংস ও রাসায়নিকের মতো সংবেদনশীল পণ্য রয়েছে।
এই ব্যবস্থা সরাসরি দেশীয় খামারি ও উদ্যোক্তাদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলবে। বাকি পণ্যগুলোর শুল্ক আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। ফলে দেশ যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে, তেমনি মার্কিন পণ্যের জোয়ারে স্থানীয় কৃষি ও শিল্প প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়বে।
অশুল্ক বাধা দূর করার নামে বাংলাদেশ মার্কিন কৃষি ও জৈব প্রযুক্তি পণ্যের ক্ষেত্রে কঠোর পরীক্ষা, নিরীক্ষা বাদ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন বা এফডিএ সনদ থাকলেই চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ সরাসরি গ্রহণ করতে হবে। বিতর্কিত জেনেটিক্যালি মোডিফাইড বা জিএমও পণ্য কোনো অতিরিক্ত লেবেলিং বা পরীক্ষা ছাড়াই দেশে প্রবেশ করবে।
এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এমনকি এমন কোনো নিয়ম রাখা যাবে না যা মার্কিন পণ্যের অবাধ প্রবাহকে বাধা দেয়। চুক্তির সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাধ্যতামূলক পণ্য আমদানির শর্ত। আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি কেনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
একইসাথে বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনাও চুক্তির অংশ। বছরে ৭ লাখ টন গমসহ মোট ৪২ হাজার কোটি টাকার কৃষি পণ্য কিনতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কম দামে পণ্য কেনার সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশ এখন চড়া দামে মার্কিন পণ্য কিনতে আইনিভাবে বাধ্য থাকবে।
চুক্তিটি কেবল বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তার ওপর মার্কিন ছায়া বিস্তার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের ওপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা দিলে বাংলাদেশকে বাধ্যতামূলকভাবে তাদের সাথে সুর মেলাতে হবে। এটি বৃহৎ শক্তির দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের নিরপেক্ষ অবস্থানের অবসান ঘটাবে।
চীন বা রাশিয়ার মতো অবাজারভিত্তিক দেশগুলোর সাথে কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার আগে মার্কিন স্বার্থের কথা ভাবতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর বা ইউরেনিয়াম ক্রয় করার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। গবেষকের এই বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে সংকটে ফেলেছে।
নির্বাচনের আগমুহূর্তে তড়িঘড়ি করে এমন চুক্তির নেপথ্য কারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অর্থনীতিবিদদের মতে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় নবগঠিত সংসদ ও সরকারের উচিত এই চুক্তির প্রতিটি ধারা পুনর্মূল্যায়ন করা। অন্যথায় বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে একটি নির্দিষ্ট শক্তির বাণিজ্যিক উপনিবেশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
জেএইচআর