ধর্মীয় সম্প্রীতি ও স্বীকৃতির নতুন দিগন্ত

রাষ্ট্রীয় সম্মানীর আওতায় ইমাম ও ধর্মীয় পুরোহিতরা

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ১৪, ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সরাসরি সম্মানী পেতে যাচ্ছেন দেশের ধর্মীয় উপাসনালয়ের সেবকরা। ১৪ মার্চ, ২০২৬ শনিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই যুগান্তকারী কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে কেবল ইসলাম ধর্মের ইমাম ও মুয়াজ্জিন নন, বরং মন্দির, গির্জা ও বৌদ্ধবিহারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এক অনন্য সম্প্রীতির বন্ধনে।

শনিবার বেলা সোয়া ১১টায় অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার বায়তুল রহমান সেন্ট্রাল মসজিদের ইমাম হোসাইন আহমেদ আবদুল্লাহর হাতে সম্মানীর প্রথম চেকটি তুলে দেন। এরপর তিনি ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার করে ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম বা আইবাস সিস্টেমে একটি ‘সেন্ট বাটন’ প্রেস করেন। এর মাধ্যমে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের পূর্বনির্ধারিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সম্মানীর টাকা পৌঁছে যায়। প্রযুক্তিনির্ভর এই স্বচ্ছ বিতরণ পদ্ধতি নিশ্চিত করে যে, সরকারি ভাতার টাকা সরাসরি প্রকৃত সুবিধাভোগীদের হাতে পৌঁছাবে।

এই কার্যক্রমটি একটি সুপরিকল্পিত প্রকল্পের অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ৪ হাজার ৯০৮টি মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা এই সুবিধার আওতায় আসছেন। ৯৯০টি মন্দিরের পুরোহিত ও সেবাইতদের জন্য সম্মানী বরাদ্দ করা হয়েছে। ১৪৪টি বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষরা এই ভাতা পাবেন এবং ৩৯৬টি গির্জার যাজক ও পালকরা রাষ্ট্রীয় এই স্বীকৃতির অংশীদার হচ্ছেন।

সরকার এই পাইলট প্রকল্পের জন্য একটি নির্দিষ্ট আর্থিক কাঠামো নির্ধারণ করেছে। এটি মূলত তৃণমূল পর্যায়ের ধর্মীয় নেতাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে। মসজিদের জন্য মাসিক ১০,০০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ইমাম পাবেন ৫,০০০ টাকা, মুয়াজ্জিন ৩,০০০ টাকা এবং খাদেম ২,০০০ টাকা। অন্যান্য উপাসনালয়ের জন্য মাসিক ৮,০০০ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যেখানে প্রধান দায়িত্বশীল যেমন পুরোহিত, অধ্যক্ষ বা যাজক পাবেন ৫,০০০ টাকা এবং সহকারী দায়িত্বশীল যেমন সেবাইত, উপাধ্যক্ষ বা পালক পাবেন ৩,০০০ টাকা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইমাম, মুয়াজ্জিন ও বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের সরকারি সম্মানী প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে, ছবি: পিএমও

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ অনুষ্ঠানে এক বিশেষ ঘোষণা প্রদান করেন। তিনি জানান, মাসিক সম্মানীর পাশাপাশি ধর্মীয় নেতাদের জন্য উৎসব বোনাসও নিশ্চিত করা হয়েছে। মুসলিম ধর্মীয় নেতারা পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় ১,০০০ টাকা করে বছরে মোট ২,০০০ টাকা বোনাস পাবেন। অন্যান্য ধর্মের নেতারা দুর্গাপূজা, বৌদ্ধপূর্ণিমা বা বড়দিনের মতো প্রধান উৎসবগুলোতে এককালীন ২,০০০ টাকা বোনাস পাবেন। তবে উপদেষ্টা স্পষ্ট করেন যে, যেসব প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বিদেশি অনুদান বা সরকারের অন্যান্য নিয়মিত বড় তহবিল থেকে সরাসরি সাহায্য পায়, তারা আপাতত এই পাইলট প্রকল্পের আওতাভুক্ত হবে না।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে ধর্মীয় নেতাদের সমাজের প্রকৃত পথপ্রদর্শক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, উপাসনালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা কেবল ধর্মীয় আচার পালন করেন না, বরং নৈতিক সমাজ গঠনেও বড় ভূমিকা রাখেন। তাদের এই নিঃস্বার্থ সেবার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমেই গড়ে উঠবে প্রকৃত ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই উদ্যোগটি বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের নতুন এক উদাহরণ তৈরি করবে। ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের দীর্ঘদিনের যে সম্মানীর দাবি ছিল, তার পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের নেতাদেরও এই তালিকায় যুক্ত করে সরকার সব ধর্মের মানুষের প্রতি সমতা প্রদর্শন করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মাঝে বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপটি এক ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। ধর্মের নামে ভেদাভেদ নয়, বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সকল ধর্মীয় সেবককে সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের আওতায় আনা একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রের পরিচায়ক। আজ থেকে শুরু হওয়া এই ডিজিটাল সম্মানী প্রদান কার্যক্রমটি আগামীর সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের ভিত মজবুত করবে বলেই বিশেষজ্ঞ মহলের প্রত্যাশা।

জেএইচআর