২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসে সারা দেশে কমপক্ষে ৬১০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৩৬ জন নিহত এবং কমপক্ষে ৪০৭৮ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
শনিবার প্রকাশিত সংস্থাটির “বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি জানুয়ারি-মার্চ, ২০২৬” শীর্ষক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬১০টি ঘটনার মধ্যে ৫৭৩টি বা ৯৪ শতাংশই ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দল ও বিএনপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষে। নিহত ৩৬ জনের মধ্যে বিএনপির ২৮ জন (৭৮ শতাংশ), জামায়াতের ৪ জন (১১ শতাংশ), আওয়ামী লীগের ১ জন এবং অন্যান্য ৩ জন রয়েছেন।
এতে আরও বলা হয়, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা, সমাবেশ কেন্দ্রিক সংঘর্ষ, প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে বিরোধ, হামলা, বাড়িঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ঘটনায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি পৃথক হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর অন্তত ৩৪টি পৃথক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় কমপক্ষে ২৯ জন আহত এবং বিএনপির ১২ জন, আওয়ামী লীগের ৪ জন, জামায়াতের ৩ জন ও অন্যান্য দলের ৩ জনসহ মোট ২২ জন নিহত হন। একই সময়ে অর্ধশতাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়া সারাদেশে সাত শতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
জানুয়ারি মাসে ১৫১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৮ জন নিহত এবং ১২৩৩ জন আহত হন। ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা বেড়ে ৩৪৬টি ঘটনায় ১০ জন নিহত ও ১৯৩৩ জন আহত হন। মার্চে তুলনামূলকভাবে ঘটনা কমে ১১৩টিতে দাঁড়ালেও নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে পৌঁছায় এবং আহত হন ৯১২ জন। প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে সহিংসতার প্রকৃতি আরও তীব্র ও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আধিপত্য বিস্তার, নির্বাচনি সহিংসতা ও রাজনৈতিক বিরোধ পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তোলে। পাশাপাশি নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ঢাকাসহ অন্তত ৩০টি জেলা ও উপজেলায় দলীয় কার্যালয় দখল বা পুনর্দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের মে মাসে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। তবে নির্বাচন শেষে দলটির নেতাকর্মীদের বিভিন্ন স্থানে কার্যালয়ে প্রবেশ বা অবস্থানের চেষ্টা ঘিরে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়।
সুপারিশ অংশে বলা হয়, মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীন বিচার সচিবালয়, বিচারক নিয়োগ, দুদক ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন জরুরি। পাশাপাশি গণভোট আদেশ ও অন্যান্য অধ্যাদেশগুলো কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দেশে আইনের শাসন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়ন সম্ভব নয়। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, মব সহিংসতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
এএন