সিলেটের প্রাণপ্রবাহ সুরমা নদীকে ঘিরে এক মহাপরিকল্পনার শুভ সূচনা করলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান। শনিবার সকাল ১১টায় নগরীর ঐতিহাসিক চাঁদনী ঘাট এলাকায় নদীটির উভয় তীরের সৌন্দর্যবর্ধন এবং টেকসই বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সিলেট সফরে এসে এই মেগা প্রকল্পের উদ্বোধন সিলেটের অবকাঠামোগত উন্নয়নে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করল।
সকাল থেকেই সিলেটের আকাশ মেঘলা থাকলেও উৎসবের আমেজে কোনো কমতি ছিল না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে সাথে নিয়ে বেলা ১১টার দিকে চাঁদনী ঘাটে পৌঁছান। সেখানে নির্ধারিত ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের কাজ শুরু করেন।
এ সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সরকারের ও স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী (সিলেটের সাবেক সফল মেয়র) আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের নকশা ও মানচিত্র পর্যবেক্ষণ করেন। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং প্রকল্প কর্মকর্তারা তাঁকে কাজের অগ্রগতির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিস্তারিত ব্রিফিং প্রদান করেন।
সুরমা রিভারফ্রন্ট বিউটিফিকেশন অ্যান্ড ফ্লাড প্রোটেকশন প্রজেক্টটি আধুনিক নগর পরিকল্পনার এক অনন্য সংমিশ্রণ। এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো:
সিলেটে গত কয়েক বছরের ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কথা মাথায় রেখে সুরমার দুই তীরে আধুনিক প্রযুক্তিতে শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এটি নগরীকে নদী ভাঙন এবং উপচে পড়া পানি থেকে রক্ষা করবে।
নদীর দুই পাড় দিয়ে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ সুপরিসর ‘ওয়াকওয়ে’ বা হাঁটার পথ তৈরি করা হবে। এছাড়া পর্যটন ও স্থানীয়দের বিনোদনের জন্য বসার স্থান, কফিশপ এবং ল্যান্ডস্কেপিং করা হবে।
সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি নদীর নাব্যতা রক্ষায় ড্রেজিং এবং বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এই প্রকল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সিলেটের ঐতিহ্যবাহী আলী আমজাদের ঘড়ি ও চাঁদনী ঘাট এলাকাকে একটি হেরিটেজ জোনে রূপান্তর করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে এই প্রকল্পে।
প্রকল্প পরিদর্শনকালে কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সিলেটকে একটি আধুনিক, সবুজ ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা তাঁর সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি নির্দেশ দেন যেন প্রকল্পের কাজে গুণগত মান বজায় রাখা হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা হয়।
বিশেষ করে সুরমা নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে এনে শহরকে দীর্ঘমেয়াদী বন্যা থেকে মুক্ত করতে এই প্রকল্পটিকে তিনি একটি ‘মডেল’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
চাঁদনী ঘাট এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর এই আগমনকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার উৎসুক জনতা ভীড় জমান। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, আরিফুল হক চৌধুরীর হাত ধরে সিলেটে যে উন্নয়নের সূচনা হয়েছিল, আজ তারেক রহমানের হাত ধরে তা পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে সুরমার পানি উপচে পড়ার যে আতঙ্ক নগরবাসীর মনে থাকে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে তার স্থায়ী সমাধান হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।
সুরমা রিভারফ্রন্ট প্রকল্পের এই উদ্বোধন ছিল প্রধানমন্ত্রীর আজ দিনের দ্বিতীয় বড় কর্মসূচি। এর আগে সকালে তিনি হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। এরপর তিনি বাইশা নদী পুনঃখনন কর্মসূচি উদ্বোধন এবং বিকেলে জেলা স্টেডিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬‘এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
সুরমা নদীর তীরে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগানোর এই উদ্যোগ কেবল সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং সিলেটের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তার জন্য এক অপরিহার্য পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী পরিকল্পনা সিলেটকে পর্যটন ও বাণিজ্যের এক নতুন কেন্দ্রে পরিণত করবে- এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।
রাতে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকায় ফেরার কথা থাকলেও, তাঁর এই সফরের রেশ এবং সুরমা তীরের এই মেগা প্রজেক্টের প্রভাব সিলেটের ইতিহাসে দীর্ঘকাল অম্লান থাকবে।
এএন