বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অতীতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সংঘাত ও আশঙ্কাজনক প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি রোধ করাই বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সামনে সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, কোনো ধরনের রক্তপাত, সহিংসতা ও পেশিশক্তির মহড়া ছাড়া সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করাই এখন কমিশনের প্রধান লক্ষ্য। তবে এই বিশাল ও জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেবল নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে সফল হওয়া সম্ভব নয়। এজন্য দেশের সব রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও সাধারণ জনগণের সর্বাত্মক সহযোগিতা ও সদিচ্ছা কামনা করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে থাইল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস’ (আনফ্রেল) আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে সিইসি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণের ওপর আনফ্রেলের প্রস্তুত করা পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। এতে দেশি-বিদেশি নির্বাচনী বিশেষজ্ঞ, কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীন বিগত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর সময় ঘটে যাওয়া সহিংসতা ও প্রাণহানির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এলেই পাড়া-মহল্লা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে যে ভয়াবহ সংঘাত ও খুনাখুনি দেখা গেছে, তা কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক সমাজের চিত্র হতে পারে না। এই ধারা থামানোই এখন সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, বিশিষ্ট নাগরিক সংগঠন ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ (সুজন)-এর সংগৃহীত তথ্য ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে দেশজুড়ে অন্তত ২৩৬ জন মানুষ নিহত হন।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতায় ১১৬ জন সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মী নিহত হন।
সিইসি বলেন, এই বিপুল প্রাণহানি প্রমাণ করে যে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনগুলোতে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কতটা তীব্র আকার ধারণ করে। আগামী দিনে যাতে আর কোনো মায়ের কোল খালি না হয়, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে কমিশন বদ্ধপরিকর।
তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচনগুলোকে নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি ‘বিরাট ও নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে উল্লেখ করে সিইসি বলেন, কমিশনকে মোট ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৬১টি পার্বত্য ও সাধারণ জেলা পরিষদ, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং প্রায় ৩৩০টি পৌরসভার নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
তিনি বলেন, একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি জটিল ও সংবেদনশীল হলো স্থানীয় সরকারের এই বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন পরিচালনা করা। কারণ এখানে প্রার্থীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যায় এবং প্রতিযোগিতা একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শতভাগ শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও রক্তপাতহীনভাবে সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশন এখন থেকেই সুনির্দিষ্ট মহাপরিকল্পনা ও কঠোর নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়নের কাজ করছে বলে জানান তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিছু বিতর্কিত ও ঋণখেলাপি ব্যক্তির অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, বিষয়টি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রার্থিতা যাচাই-বাছাই বা কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কখনো ‘চেরি পিক’ বা বেছে বেছে কাউকে সুবিধা দেওয়া কিংবা কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দেওয়ার নীতি অনুসরণ করেনি। আইন সবার জন্য সমান-এই নীতিতেই কমিশন কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে কমিশনের চলমান অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন কর্মশালার প্রসঙ্গ তুলে সিইসি বলেন, এসব কর্মশালার মাধ্যমে কমিশন নির্বাচন পরিচালনায় কোথায় কোথায় উন্নতির সুযোগ ছিল তা চিহ্নিত করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনগুলো সাধারণত পাঁচ বছরের মেয়াদে এক বা দুটি জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করে। এরপর নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করতে হয়। আগের কমিশনের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও সংকট মোকাবিলার কৌশলগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত না থাকায় নতুন কমিশনকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
নাসির উদ্দীন বলেন, বর্তমান কমিশন এই চক্র ভাঙতে চায়। এজন্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ, সংস্কার ও সমাধানগুলো নিয়ে একটি ‘নলেজ ব্যাংক’ তৈরি করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ কমিশন যেন এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে, সেটিই বর্তমান কমিশনের লক্ষ্য।
থাইল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা আনফ্রেলের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশকে স্বাগত জানিয়ে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলেন, একটি স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পর্যবেক্ষকদের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আনফ্রেল তাদের প্রতিবেদনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি যেসব ক্ষেত্রে আরও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলোও তুলে ধরেছে। কমিশন এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে জানান কর্মকর্তারা।
বক্তারা আরও বলেন, রক্তপাতহীন স্থানীয় নির্বাচন নিশ্চিত করতে পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কঠোরভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিতে হবে।
সিইসির এই দৃঢ় অবস্থান দেশের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এম জি