খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ২১, ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের অজুহাতে এবার সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে (খুচরা মূল্যে) বিদ্যুতের দাম এক লাফে বড় অঙ্কের বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। দেশের বিদ্যুৎ খাতের একক পাইকারি বিক্রেতা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং বিদ্যুৎ বিতরণকারী রাষ্ট্রীয় ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো (ডিপিডিসি, ডেসকো, নেসকো, ওজোপাডিকো ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড) গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে সর্বনিম্ন ২৯ পয়সা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৬৬ পয়সা পর্যন্ত বৃদ্ধির লিখিত প্রস্তাব পেশ করেছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর খামারবাড়িস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত এক উন্মুক্ত গণশুনানিতে বিতরণ সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এই দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। বিইআরসি চেয়ারম্যান ও কমিশনের অন্যান্য সদস্যদের উপস্থিতিতে এই শুনানিতে খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং ভোক্তা অধিকার রক্ষা আন্দোলনের নেতারা অংশ নেন।

 কেন এই দাম বাড়ানোর প্রস্তাব? বিইআরসি ও পিডিবির আর্থিক হিসাব

গণশুনানির শুরুতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক আয়-ব্যয়ের একটি কারিগরি ও আর্থিক চিত্র তুলে ধরা হয়। বিইআরসি জানায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি খরচ, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের রেন্টাল চার্জ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় আমূল বেড়ে যাওয়ায় পিডিবির উৎপাদন খরচ আকাশচুম্বী হয়েছে।

কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ক্রয়ে পিডিবির গড় খরচ পড়বে ৮ টাকা ৫৭ পয়সা। এর সাথে বিতরণকারী সংস্থাগুলোর গড় বিতরণ খরচ যুক্ত হবে আরও ৯২ পয়সা। ফলে সামগ্রিকভাবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পেছনে প্রকৃত খরচ দাঁড়াচ্ছে ৯ টাকা ৪৯ পয়সা।

বিইআরসি আরও উল্লেখ করে, বর্তমানে দেশের খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় বিক্রয়মূল্য রয়েছে ৯ টাকা ২০ পয়সা। অর্থাৎ, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করতে গিয়ে বিদ্যুৎ খাতের এখন সরাসরি ২৯ পয়সা করে নিট ঘাটতি বা লোকসান থেকে যাচ্ছে। পাইকারি মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করে এই বিশাল আর্থিক ঘাটতি বা লোকসান সমন্বয় করার লক্ষ্যেই মূলত খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই গণশুনানি ও প্রস্তাবনা আহ্বান করা হয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করেই পিডিবি প্রতি ইউনিটে গড়ে ২৯ পয়সা বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে।

কোন সংস্থা গ্রাহক পর্যায়ে কত টাকা বাড়াতে চায়?

গণশুনানিতে ঢাকার দুই প্রধান বিতরণ সংস্থাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ আর্থিক লোকসান ও ভবিষ্যৎ ব্যয়ের হিসাব কষে দাম বাড়ানোর পৃথক প্রস্তাবনা জমা দেয়। সংস্থাগুলোর প্রস্তাবের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. নেসকো (NESCO): সর্বোচ্চ ১ টাকা ৬৬ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব

দেশের উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) এবারের শুনানিতে সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ানোর দাবি তুলেছে। তারা গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ৬৬ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের দাবি, উত্তরাঞ্চলের ভৌগোলিক ও বিতরণ ব্যবস্থার কারণে তাদের পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি, যা বর্তমান মূল্যে সমন্বয় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

 ২. ডিপিডিসি (DPDC) ১ টাকা ৬১ পয়সা বৃদ্ধির দাবি

রাজধানীর একাংশ ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিট প্রতি ১ টাকা ৬১ পয়সা মূল্য বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে। ডিপিডিসি জানায়, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম এবং হুইলিং চার্জ (সঞ্চালন মাশুল) যদি বর্তমান স্তরেই অপরিবর্তিত থাকে, তবে তাদের আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সর্বনিম্ন ১ টাকা ৬১ পয়সা মূল্য সমন্বয় করতে হবে।

তবে ডিপিডিসি শুনানিতে একটি সতর্কবার্তাও দিয়েছে। সংস্থাটি জানায়, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম যদি ৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, তবে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সর্বনিম্ন ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।

 ৩. ডেসকো (DESCO) ৮৬ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব

রাজধানীর মিরপুর, উত্তরা, গুলশানসহ উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য প্রতি ইউনিটে ৮৬ পয়সা বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করেছে। বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন ও আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবলিং প্রকল্পের ব্যয়ের কারণে এই সমন্বয় জরুরি বলে দাবি ডেসকোর।

 ৪. ওজোপাডিকো (WZPDCO) ৮৫ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (খুলনা ও বরিশাল বিভাগ) বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিট প্রতি ৮৫ পয়সা দাম বাড়ানোর প্রস্তাবনা পেশ করেছে।

 ৫. পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (REB): ৫০ পয়সা বাড়ানোর দাবি

দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক এবং গ্রামের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রধান মাধ্যম হলো বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। লোকসান আনিয়ে উঠে আর্থিক বিপর্যয় কাটাতে সংস্থাটি গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিট প্রতি ৫০ পয়সা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। আরইবি শুনানিতে আশঙ্কা প্রকাশ করে জানায়, যদি বর্তমান দাম বহাল থাকে, তবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সংস্থাটির মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি থেকে বাঁচতে ৫০ পয়সা বৃদ্ধি করা ছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই।

ভোক্তাদের উদ্বেগ ও জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর এমন পাইকারি হারে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব আসায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ গ্রাহক ও ভোক্তা অধিকার কর্মীরা। তাদের মতে, বাজারে এমনিতেই চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। মানুষ যখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তা সাধারণ মানুষের পিঠে 'মরার ওপর খাঁড়ার ঘা' হিসেবে দেখা দেবে।

ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের প্রতিনিধিরা শুনানিতে বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে শুধু যে মাসের বিদ্যুৎ বিল বাড়বে তা নয়; এর একটি চেইন রিঅ্যাকশন বা বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে কলকারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, যার ফলে উৎপাদিত প্রতিটি পণ্যের দাম বাজারে আরও এক দফা বৃদ্ধি পাবে। সেচ পাম্পের খরচ বাড়ায় কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচও বাড়বে। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতির পারদ আরও উঁচুতে উঠবে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে চরম সংকটে ফেলবে।

পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও সিদ্ধান্ত

বিইআরসি আইন অনুযায়ী, গণশুনানি সমাপ্ত হওয়ার পর বিতরণ সংস্থাগুলোর দেওয়া প্রস্তাবনা, ক্যাবের (কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) যুক্তি এবং কমিশনের নিজস্ব কারিগরি কমিটির মূল্যায়ন প্রতিবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। সমস্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত আদেশ বা ট্যারিফ ঘোষণা করবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিইআরসি যাই সিদ্ধান্ত নিক না কেন, বিতরণ সংস্থাগুলোর এই মরিয়া প্রস্তাবনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আগামী দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে বিদ্যুতের জন্য আরও বড় অঙ্কের টাকা খসে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত।

এএন