গত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে যে এক অভূতপূর্ব এবং দৃশ্যমান ‘কঠিন সময়’ বা টানাপোড়েন চলছিল, তার অবসান ঘটিয়ে এবার একটি ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে নয়াদিল্লি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায় এবং গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই ঢাকা-দিল্লি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে পুনরায় সচল করতে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করতে রাজি নয় ভারত। তবে সম্পর্কের এই নতুন পর্বে মোদি সরকার ‘মানুষে মানুষে যোগাযোগ’ কে সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার ঘোষণা দিলেও, ভারতের প্রতিবেশী নীতিতে চিরন্তন ‘নিরাপত্তা’র বিষয়টিই বরাবরের মতো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ আমন্ত্রণে বাংলাদেশের ২৬ জন জ্যেষ্ঠ সম্পাদক ও সংবাদকর্মীর একটি প্রতিনিধিদল ৩ থেকে ৯ মে পর্যন্ত দিল্লি ও মুম্বাই সফর করেন। এই সফরের সময় ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি, সাবেক জাতীয় উপনিরাপত্তা উপদেষ্টা ও ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির প্রাক্তন হাইকমিশনার পঙ্কজ সরনসহ একাধিক শীর্ষস্থানীয় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। সেইসব দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময় থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের আগামী দিনের এক নতুন সমীকরণ ও গতিপ্রকৃতির স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার ও দিল্লির তাৎক্ষণিক সাড়া
ভারতের কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনকালে দুই নিকট প্রতিবেশীর সম্পর্কের পারদ যে বেশ নিচে নেমে গিয়েছিল, তা এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ঢাকার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সরকার গঠনের সাথে সাথেই দিল্লি তার কৌশল পরিবর্তন করে। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পর এক মুহূর্ত সময় অপচয় না করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নবনির্বাচিত সরকারকে তথা বিএনপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান নেতা তারেক রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান।
সম্পর্কের এই নতুন যাত্রাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে ঢাকার নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরলাকে বিশেষ দূত হিসেবে পাঠায় নয়াদিল্লি। ওম বিরলা ঢাকায় এসে শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি বিশেষ চিঠি সরাসরি তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন। এই পদক্ষেপগুলো স্পষ্ট করে যে, দিল্লি বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে গ্রহণ করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছে।
একাত্তরের পর প্রথম, ঢাকায় রাজনীতিবিদ হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোদি সরকারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও কৌশলগত পদক্ষেপ হলো পেশাদার কূটনীতিবিদদের পরিবর্তে একজন ঝানু রাজনীতিবিদকে ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া।
ভারতের সাবেক রেলমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অত্যন্ত আস্থাভাজন ও সম্মানিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতের নতুন দূত হিসেবে পাঠানো হচ্ছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদকে ঢাকায় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিল ভারত।
দিল্লিভিত্তিক কৌশলগত ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ন্যাটস্ট্র্যাটের সমন্বয়ক পঙ্কজ সরন এই নিয়োগকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, দীনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন পোড় খাওয়া ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে ঢাকায় পাঠানোর অর্থ হলো, নরেন্দ্র মোদি দুই দেশের রাজনৈতিক পরিসরে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধ তৈরি করতে চান।
একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলোকে শুধু আমলাতান্ত্রিক বা প্রথাগত কূটনৈতিক চশমা দিয়ে দেখবেন না ,বরং তিনি বৃহত্তর সামাজিক, রাজনৈতিক এবং মানুষে মানুষে সম্পর্কের ব্যাপকতর পরিসর থেকে বিষয়গুলো মূল্যায়ন করবেন। তিনি বাংলাদেশের সমাজ এবং ভারতের প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর (যেমন পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ইত্যাদি) অভ্যন্তরীণ রসায়ন সম্পর্কে গভীর ধারণা রাখেন, যা দুই দেশের ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে দিল্লিকে সঠিক নীতিনির্ধারণে সাহায্য করবে।
সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ‘নিরাপত্তা’ ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
মানুষকে কেন্দ্রে রেখে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হলেও, ভারতের প্রতিবেশী নীতিতে ‘নিরাপত্তা’র বিষয়টি যে দিল্লির কাছে সবার আগে থাকবে, তা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন পঙ্কজ সরন। গত ৫ মে এক আলাপচারিতায় তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সমৃদ্ধি, উন্নয়ন ও কানেক্টিভিটি বা সংযুক্তি নিশ্চিত করার প্রধান শর্ত হলো স্থিতিশীলতা।
আর এই স্থিতিশীলতার স্বার্থেই নিরাপত্তা জোরদার করা ভারতের প্রথম লক্ষ্য। ভারতকে বাদ দিয়ে বা ভারতের নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলে এই অঞ্চলে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। দিল্লির লক্ষ্য হলো, প্রতিবেশী নীতিতে পাকিস্তানকে সম্পূর্ণ আলাদা বা বিচ্ছিন্ন রেখে বাকি দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে একটি নিরাপদ অর্থনৈতিক বলয় তৈরি করা।
তবে দিল্লির কূটনৈতিক মহলে এই মুহূর্তে বড় প্রশ্ন হলো- যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সমীকরণ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে যখন ভারতের সাথে ঢাকার দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, ঠিক সেই সময়ে ওয়াশিংটন, বেইজিং ও ইসলামাবাদের সাথে ঢাকার সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ হয়। বিশ্লেষকদের মতে, গত পাঁচ দশকের মধ্যে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সবচেয়ে সুবর্ণ সময় পার করছে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব তো পড়েইনি, উল্টো চীন এই সুযোগে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ বাংলাদেশের সবকটি প্রধান রাজনৈতিক দলের সাথে সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। একই সময়ে পাকিস্তানও বাংলাদেশের সাথে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে তাদের সম্পর্কের পালে হাওয়া দিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনের পরও বাংলাদেশের সাথে এই তিন দেশের সম্পর্কের কোনো ছন্দপতন ঘটেনি। সমানতালে তা এগিয়ে চলেছে।
ভারতের সাবেক জাতীয় উপনিরাপত্তা উপদেষ্টা পঙ্কজ সরন বলেন, ভবিষ্যতে ভারতের জন্য বড় প্রশ্ন হবে- বাংলাদেশের নতুন সরকার চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্ক কীভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে নেবে এবং এই ত্রিমুখী সমীকরণে ভারতের অবস্থানটা ঠিক কোথায় থাকবে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওয়াশিংটনের সাথে দিল্লির এক ধরনের শীতলতা বা টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী বাংলাদেশে এই তিন দেশের প্রভাবের ওপর সতর্ক নজর রাখছে সাউথ ব্লক। তবে ৪ মে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির সাথে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের মতবিনিময়ের সময় ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কের উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি অত্যন্ত সতর্ক ও পরিপক্ব কূটনৈতিক উত্তর দেন।
বিক্রম মিশ্রি বলেন, বাংলাদেশ কোন দেশের সাথে কী ধরনের সম্পর্ক রাখবে, তা সম্পূর্ণ বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশই তা ঠিক করবে। আমি শুধু এটুকুই বলব, কোনো তৃতীয় দেশের সাথে সম্পর্কের কারণে বা কোনো নেতিবাচক পদক্ষেপের ফলে যেন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ইতিবাচক ও দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগগুলো ব্যাহত না হয়।
গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, ৪০ বছরের উপাত্তের অপরিহার্যতা
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন ও হিস্যা সব সময় আলোচনার শীর্ষে থাকে এবং আগামী দিনেও এর ব্যতিক্রম হবে না। বিশেষ করে, চলতি ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসেই শেষ হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালে যখন এই চুক্তি সই হয়েছিল, তখন ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সালের (চার দশকের) নদীর গড় জলপ্রবাহকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছিল।
এই চুক্তি নবায়নের বিষয়ে পঙ্কজ সরন বলেন, তিন দশক পেরিয়ে যাওয়ার পর ২০২৬ সালের শেষে পুরনো উপাত্ত বা ডেটা আর কার্যকর থাকবে না। নতুন বাস্তবতায় চুক্তি করতে হলে ১৯৮৬ সাল থেকে পরবর্তী ৪০ বছরের নদীর গড় প্রবাহের উপাত্ত বা উপাত্ত বিবেচনা করা বাঞ্ছনীয়। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত কারণে গঙ্গার পানি প্রবাহ যেমন কমেছে, তেমনি দুই দেশেই পানির ব্যবহার ও চাহিদাও অনেক বেড়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই চুক্তির সফল দর-কষাকষি নির্ভর করবে দুই দেশ একে অপরের ‘নতুন বাস্তবতা’ কতটা মেনে নিতে পারছে তার ওপর।
ভারতের সাবেক কূটনীতিকদের মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে বিজেপি সেখানে ক্ষমতায় এখন , তবে তিস্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পন্ন করা কেন্দ্রের জন্য অনেক সহজ হবে। তবে রাজনৈতিক বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি জানান, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল তিস্তা চুক্তিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে না, কারণ ভারতের পররাষ্ট্রনীতি সর্বদা কেন্দ্র বা দিল্লি থেকে পরিচালিত হয়।
একই সাথে তিস্তা নদীতে চীনের প্রস্তাবিত বৃহদায়তন মহাপরিকল্পনা বা প্রকল্প নির্মাণের বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করে বিক্রম মিশ্রি বলেন, তিস্তায় আধুনিক প্রকল্প করার বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে একটি সুনির্দিষ্ট ও আকর্ষণীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের নতুন সরকার চাইলে আমরা সেই প্রস্তাব নিয়ে পুনরায় আনুষ্ঠানিক আলোচনার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছি।
বাণিজ্যিক বাধা দূরীকরণ ও ‘সেপা’র সম্ভাবনা
দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক কিন্তু স্থবির হয়নি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৩ বিলিয়ন (১ হাজার ৩০০ কোটি) মার্কিন ডলারের বেশি। এর আগের দুই অর্থবছরেও এই বাণিজ্যের পরিমাণ যথাক্রমে সাড়ে ১২ এবং ১৩ বিলিয়ন ডলার ছিল।
ভারতের শীর্ষস্থানীয় বণিক সংগঠন ‘কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজ’ (CII)-এর জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের মতে, দুই দেশের মধ্যে প্রস্তাবিত ‘সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ বা সেপা (CEPA) সই হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগে এক বিশাল বিপ্লব ঘটবে। কারণ সেপা শুধু সাধারণ পণ্য বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সেবা খাত বিনিয়োগে পারস্পরিক সহায়তা, প্রযুক্তি বিনিময় এবং মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নকেও অন্তর্ভুক্ত করবে।
দিল্লি সফরকালে বাংলাদেশের সংবাদকর্মীরা সিআইআই-এর সদর দপ্তরে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। সেখানে সিআইআই-এর আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিষয়ের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা জানান, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান পর্বটি শুধু বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্যই নয়, বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে পরবর্তী ধাপে উন্নীত করার জন্য অত্যন্ত ক্রুশিয়াল বা গুরুত্বপূর্ণ।
দুই দেশের ব্যবসা বৃদ্ধির সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিকিৎসা পর্যটন খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ , কৃষি খাতের মূল্য শৃঙ্খল উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, স্টার্টআপ কালচার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প (MSME)-কে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারতের ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো এবং ফিনটেকের সফল অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বাংলাদেশকে ভারতের বাজারে সুবিধা দিতে হলে গত বছর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও পাট রপ্তানির ওপর ভারত যে বিভিন্ন বিধিনিষেধ ও অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছিল, সেগুলোর দ্রুত সুরাহা করা জরুরি। একই সাথে মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়াতে ভারতীয় ভিসা প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও সহজ করার দাবিও উঠেছে।
হাত ধরাধরির বিকল্প নেই, অমিত ভান্ডারি
মুম্বাইভিত্তিক বিখ্যাত ভূ-রাজনৈতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘গেটওয়ে হাউস, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অন গ্লোবাল রিলেশনস’-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো অমিত ভান্ডারির মতে, বর্তমানের জটিল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক যে উত্তপ্ত প্রেক্ষাপট, তাতে বাংলাদেশ ও ভারতের একে অন্যের হাত ধরাধরি করে পথ চলা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বিকল্প নেই।
গত ৭ মে মুম্বাইয়ের জিও ওয়ার্ল্ড সেন্টারে বসে এক দীর্ঘ আলাপচারিতায় অমিত ভান্ডারি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্য এই মুহূর্তে অস্তিত্বের লড়াই। এই চার প্রতিবেশীর সাথে ভারতের সুসম্পর্ক বজায় থাকলে পাকিস্তান বা চীনের পক্ষ থেকে আসা যেকোনো কৌশলগত চ্যালেঞ্জ উত্তরণ করা ভারতের জন্য সহজ হবে।
তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয় সামনে এনে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে আগামী দুই বছর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের বড় চাপ বা ডলার সংকট তৈরি হতে পারে। এই কঠিন সময়ে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের পাশে থাকা ভারতের দায়িত্ব।
তবে তিনি এ-ও মনে করিয়ে দেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির কারণে খোদ ভারতেই কর্মসংস্থানে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে শুরু করেছে, যার জের দেশটির অর্থনীতিতে থাকবে। এমন একটি জটিল অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ভারতকে তার নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিচার করেই বাংলাদেশকে আর্থিক সহায়তার হাত বাড়াতে হবে।
সাউথ ব্লকের বর্তমান বার্তা পরিষ্কার- পেছনের তিক্ততা ভুলে একটি নতুন বাস্তবতায় ঢাকার সাথে অংশীদারত্বের এক নতুন সোনালী অধ্যায় গড়তে চায় দিল্লি, যেখানে বাণিজ্য ও মানুষ থাকবে সামনে, আর নিরাপত্তা থাকবে নেপথ্যের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে।
এএন