শিশু রামিসার বাসায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, দিলেন দ্রুত বিচারের আশ্বাস

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: মে ২১, ২০২৬, ১০:৪২ পিএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার পল্লবী এলাকায় নিহত আট বছরের শিশুর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে তার বাসায় যান। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর পল্লবীতে পাশবিক হত্যাকাণ্ডের শিকার আট বছর বয়সী সেই শিশুটির শোকার্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার রাতে মন্ত্রিসভার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষ করেই তিনি সরাসরি ছুটে যান পল্লবীতে নিহতের বাসায়। সেখানে সন্তানহারা পিতা-মাতা ও স্বজনদের বুকে টেনে নিয়ে গভীর সমবেদনা জানান সরকারপ্রধান। একই সঙ্গে এই বর্বরোচিত অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রেস উইং জানায়, প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার রাতে পল্লবীতে পৌঁছানোর পর সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মা-বাবার কান্না দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি প্রধানমন্ত্রীও। তিনি পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান এবং আশ্বস্ত করেন যে, অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, দেশের প্রচলিত আইনে তার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এই দুঃখজনক ঘটনায় রাষ্ট্র ও সরকার সম্পূর্ণভাবে ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই আকস্মিক ও সংবেদনশীল পরিদর্শনে তাঁর সঙ্গে সরকারের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। সফরসঙ্গী হিসেবে নিহত শিশুর বাসায় যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আবদুল্লাহ এম ছালেহ এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।

পরিদর্শনকালে আইন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী অবিলম্বে তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আদালতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিলের নির্দেশ দেন। মামলাটি যাতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সেই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে আইনমন্ত্রীকে বিশেষভাবে তাগিদ দেন সরকারপ্রধান।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ প্রশাসন থেকে জানা গেছে, নৃশংসতার শিকার ওই শিশুটি স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে প্রতিদিনের মতো সে বাসা থেকে বের হয়েছিল। এরপরই শুরু হয় নিখোঁজ রহস্য। অভিযোগ রয়েছে, পাশের ফ্ল্যাটের এক ভাড়াটিয়া শিশুটিকে চকোলেট বা অন্য কোনো প্রলোভন দেখিয়ে ফুসলিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়।

পরবর্তী সময়ে দীর্ঘক্ষণ পার হয়ে গেলেও শিশুটি ঘরে না ফেরায় পরিবারের পক্ষ থেকে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। একপর্যায়ে সন্দেহভাজন ওই ফ্ল্যাটের ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ শিশুটির খণ্ডিত ও রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, শিশুটিকে পাশবিক নির্যাতন বা ধর্ষণের পর অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করে মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে খণ্ড-বিখণ্ড করা হয়েছিল। এই অমানবিক ও পৈশাচিক ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুরো পল্লবী এলাকায় তীব্র ক্ষোভ, উত্তেজনা ও শোকের ছায়া নেমে আসে। স্থানীয় বাসিন্দারা অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। 

হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই তৎপর হয়ে ওঠে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত এবং ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করে।

এই জঘন্যতম অপরাধের ঘটনায় নিহত শিশুটির বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় গ্রেপ্তারকৃত দম্পতিসহ অজ্ঞাতনামা আরও এক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মামলার তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ক্রাইম সিনের নানাবিধ আলামত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, যা আদালতে অপরাধ প্রমাণে অকাট্য দলিল হিসেবে কাজ করবে।

তিনি বলেন, গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই পুলিশের কাছে নিজেদের অপরাধের কথা স্বীকার করে অভিযুক্তরা। এরপর গতকাল বুধবার (২০ মে) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হলে মূল আসামি সোহেল রানা বিচারকের খাসকামরায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দিতে সে কীভাবে শিশুটিকে ফুসলিয়ে নিয়ে যায় এবং কীভাবে এই হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করে, তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর পরিদর্শনে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, বর্তমান সরকার দেশে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে 'জিরো টলারেন্স' বা শূন্য সহনশীলতা নীতি বজায় রাখছে। বিশেষ করে শিশু ও নারীদের ওপর যেকোনো ধরনের সহিংসতা রুখতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পল্লবীর এই ঘটনাটি সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের একটি রূপ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধীদের এমন শাস্তি দেওয়া হবে যা ভবিষ্যতে এই ধরনের জঘন্য অপরাধ করতে অন্যদের মনে কাঁপন ধরিয়ে দেবে।

পরিদর্শন শেষে উপস্থিত স্থানীয় সাধারণ মানুষের সঙ্গেও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি সবাইকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখতে বলেন। একই সঙ্গে নিজ নিজ এলাকায় শিশুদের নিরাপত্তা এবং অপরিচিত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধির ওপর নজর রাখার জন্য পাড়া-মহল্লার সামাজিক সংগঠন ও অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এই প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এই মামলার আইনি প্রক্রিয়া কোনোভাবেই দীর্ঘায়িত হতে দেওয়া হবে না। আমরা সব ধরনের আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করে দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর, যাতে ভুক্তভোগী পরিবারটি উপযুক্ত বিচার পায়। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ঘটনার পেছনে অন্য কারও প্ররোচনা বা কোনো চক্র জড়িত রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের বিশেষ টিম কাজ করছে।

পল্লবীর এই অবোধ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। দেশের সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে মানবাধিকার কর্মীরাও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সশরীরে উপস্থিতি এবং দ্রুত বিচারের আশ্বাস শোকার্ত পরিবারটির মনে কিছুটা হলেও সান্ত্বনা ও আশার আলো জুগিয়েছে।

জেএইচআর