দীর্ঘ ১৪ বছরের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বমঞ্চে আবারও বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করলেন নারী পর্বতারোহী নুরুন্নাহার নিম্নি। আজ বুধবার ভোরে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা ওড়ান তিনি। নেপাল সময় সকাল ৫টা ২৪ মিনিটে এই ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেন তিনি।
চলতি মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র অভিযাত্রী হিসেবে এভারেস্ট জয় করার অনন্য কীর্তি গড়লেন নিম্নি। কাঠমান্ডুর ‘এইটকে এক্সপেডিশন’-এর একজন অভিজ্ঞ শেরপা এই পুরো অভিযানে তাঁর সহযোগী হিসেবে সাথে ছিলেন। নিম্নির এই সাফল্যে দেশের পর্বতারোহণ অঙ্গনে আনন্দের জোয়ার বইছে।
২০১২ সালে মে মাসে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে নিশাত মজুমদার এবং তার ঠিক এক সপ্তাহ পর ওয়াসফিয়া নাজরীন এভারেস্টের চূড়ায় পা রেখেছিলেন। এরপর দীর্ঘ ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো বাংলাদেশি নারীর হাত ধরে এভারেস্ট জয় সম্ভব হয়নি। নুরুন্নাহার নিম্নি সেই খরা কাটিয়ে নতুন ইতিহাস লিখলেন।
রংপুরে বেড়ে ওঠা নিম্নি পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে। বর্তমানে তিনি পূবালী ব্যাংক পিএলসির জেনারেল ব্যাংকিং বিভাগে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। তাঁর এই দুঃসাহসিক অভিযানের মূল স্পনসর বা পৃষ্ঠপোষকও ছিল এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ২০০৬ সালে সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ফিল্ডওয়ার্কে গিয়ে প্রথম পাহাড়ের প্রতি টান অনুভব করেন নিম্নি। এরপর বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়সহ ভুটান, ভারতের সিকিম ও নেপালের বিভিন্ন ট্রেইলে ট্রেকিংয়ের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকেন। ২০২০ সালে এভারেস্ট বেজক্যাম্প ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা তাঁকে পেশাদার পর্বতারোহণে উদ্বুদ্ধ করে। পরে ২০২২ সালে দার্জিলিংয়ের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে তিনি উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন।
এভারেস্ট জয়ের লক্ষ্যে গত ১১ এপ্রিল ঢাকা থেকে নেপাল যান নিম্নি। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছান এভারেস্ট বেজক্যাম্পে। মে মাসের ১৭ তারিখে চূড়ান্ত আরোহণের জন্য বেজক্যাম্প ছাড়েন এবং ধাপে ধাপে ২৩ মে পৌঁছান ক্যাম্প-৪-এ। তবে আবহাওয়া চরম বৈরী রূপ ধারণ করায় সেবার চূড়ার একদম কাছাকাছি গিয়েও নিচে নেমে আসতে বাধ্য হন।
ধৈর্য না হারিয়ে অনুকূল আবহাওয়ার আশায় কয়েক দিন ক্যাম্প-২-এ অবস্থান করেন নিম্নি। অবশেষে ২৫ মে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ভালো হতেই আবারও ব্যাকুল চিত্তে যাত্রা শুরু করেন। ২৬ মে ক্যাম্প-৪-এ পৌঁছেই ওই দিন সন্ধ্যায় শুরু করেন চূড়ান্ত আরোহণ। সব বাধা পেরিয়ে আজ ভোরে পা রাখেন এভারেস্টের শিখরে।
১৯৫৩ সালে এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগের প্রথম এভারেস্ট জয়ের পর, বাংলাদেশ এই তালিকায় নাম লেখায় ২০১০ সালে। নুরুন্নাহার নিম্নিসহ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন অদম্য সন্তান এই চূড়ায় দেশের পতাকা ওড়াতে সক্ষম হয়েছেন।
বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের (বিএমটিসি) ব্যানারে অংশ নেওয়া নিম্নির এই জয়, বাংলাদেশের নারীদের জন্য এক নতুন অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে।
এএন