প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক

উপদেষ্টাদের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত

বিশেষ প্রতিনিধি প্রকাশিত: অক্টোবর ২২, ২০২৫, ১১:৩৬ পিএম

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। 

বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ধারাবাহিক বৈঠকে অংশ নেয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। 

দুটি দলই প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে সরকারের গঠন, উপদেষ্টা পরিষদের ভূমিকা ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে মতামত জানায়।

তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে “বিতর্কিত উপদেষ্টারা”। 

এনসিপি ও জামায়াত দুটি দলই নাম প্রকাশ না করে কিছু উপদেষ্টার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। 

অপরদিকে এনসিপি মনে করছে, উপদেষ্টা পরিষদে বড় ধরনের পরিবর্তনের এখন সুযোগ নেই।

বুধবার সন্ধ্যায় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে এসে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, আমরা বলেছি, আপনার (প্রধান উপদেষ্টার) প্রতি আমাদের আস্থা আছে। কিন্তু আপনার পাশে কিছু লোক আপনাকে বিভ্রান্ত করে, তারা কোনো দলের পক্ষে কাজ করে এমনটা আমাদের মনে হয়। তাই তাদের ব্যাপারে আপনাকে সতর্ক থাকতে বলেছি। তার ভাষায়, এটি কোনো অপসারণ দাবি নয়, বরং দৃষ্টি আকর্ষণ। 

তিনি বলেন, আমরা এখনই কাউকে অপসারণ চাইনি। সময় দিচ্ছি। শুনতে দিচ্ছি। পরে না হলে আমরা নিজেদের করণীয় ঠিক করব।

তাহের আরও বলেন, জামায়াত এখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তোলেনি, কারণ বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। তার আশা, আদালতের রায় অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা পালন করবে।

বৈঠকে “জুলাই সনদ” বাস্তবায়ন প্রসঙ্গটি গুরুত্ব পেয়েছে। জামায়াতের দাবি সনদটিকে শুধু একটি রাজনৈতিক চুক্তি নয়, সাংবিধানিক মর্যাদা দিতে হবে।

তাহের বলেন, অধ্যাদেশ দুর্বল। সংবিধানসম ক্ষমতা আদেশের মাধ্যমে আসে। তাই একটি ‘অর্ডার’-এর মাধ্যমে জুলাই সনদকে বৈধতা দিতে হবে।

তার দাবি, প্রধান উপদেষ্টা এ বিষয়ে একমত হয়েছেন এবং বলেছেন যা যা করা দরকার, তিনি করবেন ইনশাআল্লাহ।

জামায়াতের প্রস্তাব অনুসারে, নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদের অনুমোদন নেওয়ার পরিকল্পনাও আলোচিত হয়েছে।

একদিন আগেই একই স্থানে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেয় বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, নির্বাচনের আগে প্রশাসন ও উপদেষ্টা পরিষদকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হতে হবে।

বিএনপি নেতারা বলেছেন, সরকারের ভেতরে যদি কারও দলীয় সম্পৃক্ততা থাকে, তাকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে।

এর আগে, বুধবার বিকেলে জামায়াতের আগে যমুনায় বৈঠক করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। 

দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদ পুরো পরিবর্তনের সুযোগ নেই। কেউ যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলে, তাদের উদ্দেশ্য ভালো নয়।

তিনি মনে করেন, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার চলছে, সেটির মধ্যদিয়েই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন সম্ভব।

নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে বিএনপি–জামায়াতের দাবির প্রতি স্পষ্ট পরোক্ষ সমালোচনা লক্ষ্য করা গেছে।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই সনদ অনুযায়ী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপে বসেছে। সনদে নির্বাচন, প্রশাসন নিরপেক্ষকরণ ও গণভোটের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় মতভেদ দেখা দিয়েছে।

সব দলই নির্বাচনের পূর্বে বিশ্বাসযোগ্য প্রশাসন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের ওপর জোর দিয়েছে। তবে জুলাই সনদের সাংবিধানিক মর্যাদা, উপদেষ্টা পরিষদের স্বচ্ছতা এবং বহিরাগত প্রভাব নিয়ে মতবিরোধ প্রকট।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংলাপ যতই এগোচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে ততই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, অধ্যাপক ইউনূস এখন দ্বিমুখী চাপের মুখে। বিএনপি ও জামায়াত নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তুলছে, আবার এনসিপি ও নাগরিক ঐক্য স্থিতিশীলতা চায়। এ অবস্থায় প্রতিটি সিদ্ধান্ত তার জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, “যদি উপদেষ্টা পরিষদের ভেতর আস্থার সংকট বাড়ে, তাহলে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হতে পারে। তাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা।“

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এখন পর্যন্ত কোনো দলের প্রকাশ্য সমালোচনার জবাব দেননি। বৈঠকগুলোর পর তার দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, “সব মতামত শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে, রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি-আপত্তি ইঙ্গিত দিচ্ছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে পুনর্গঠনের চাপ বাড়ছে।

জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে যে সমঝোতার সূচনা হয়েছিল, তা এখন নতুন মতবিরোধের মুখে। অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য সামনে দিনগুলো কঠিন হতে পারে। একদিকে সাংবিধানিক বৈধতা রক্ষা, অন্যদিকে রাজনৈতিক আস্থা টিকিয়ে রাখা দুটি ভারসাম্য একসঙ্গে ধরে রাখা এখনই অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

ইএইচ