সালাহউদ্দিন আহমদ

রেফারির ভূমিকা ভুলে গিয়ে কমিশন এখন খেলায় অংশ নিচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: অক্টোবর ২৯, ২০২৫, ০৩:৪৫ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক 
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সর্বশেষ সুপারিশ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তার অভিযোগ, কমিশনের সুপারিশে জুলাই সনদের মূল চেতনা ও প্রতিশ্রুতির সঠিক প্রতিফলন নেই। বরং এমন কিছু প্রস্তাব যুক্ত হয়েছে, যা জাতিকে ঐক্যের বদলে বিভক্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

বুধবার রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে বিএনপির আয়োজিত ‘ফ্রম রুল বাই পাওয়ার টু রুল অব ল: ট্রানজিশন টু আ ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে তিনি এমন অভিযোগ করেন।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা এতদিন ভেবেছিলাম জাতীয় ঐকমত্য কমিশন একটি রেফারি যে পক্ষপাতহীনভাবে মাঠের খেলা দেখবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, রেফারিই নিজে গোল দিতে নেমে পড়েছে। কমিশন, সরকার এবং আরও দু–তিনটি দল একই দলে খেলছে, আর আমরা যেন বিপক্ষ।’

কমিশনের প্রস্তাব ও সরকারের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে একে–অপরের পরিপূরক। যে কমিশনকে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তারা এখন এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যা অনৈক্য সৃষ্টি করবে, বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিএনপির এই নেতা দাবি করেন, কমিশনের দেওয়া ৯৪ পৃষ্ঠার দলিলে ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের হুবহু প্রতিফলন নেই।

তিনি বলেন, ‘ঐতিহাসিক সেই অনুষ্ঠানে যে দলিলের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কমিশনের রিপোর্টে তা দেখা যায়নি। শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাব ও কমিশনের নিজস্ব ব্যাখ্যা রাখা হয়েছে। অথচ কীভাবে ঐকমত্যে পৌঁছানো হলো, কারা মতভেদ জানিয়েছে, সেসব কিছুই নেই।’

সালাহউদ্দিন আহমদ প্রশ্ন তোলেন, যদি কমিশনের লক্ষ্য ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয়, তবে এই অস্পষ্টতা কেন রাখা হলো? এতে বরং সন্দেহ ও বিভাজনই বাড়ছে।

নির্বাচন সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সালাহউদ্দিন। 

তার অভিযোগ, আরপিওতে এমনভাবে পরিবর্তন আনা হয়েছে, যাতে জোটভুক্ত দলগুলোর জন্য নিজস্ব প্রতীকে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আগে ইচ্ছে করলে জোটের প্রতীকেও নির্বাচনে অংশ নেওয়া যেত। এখন তা আর সম্ভব নয়। এটি অগণতান্ত্রিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তিনি আরও বলেন, একটি দল এই পরিবর্তনে সরকারের সঙ্গে সুর মিলিয়েছে। এতে বোঝা যায়, নির্বাচনকে আগেভাগেই প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যদি সত্যিই জাতির আস্থা অর্জন করতে চায়, তাহলে তাদের আচরণে নিরপেক্ষতা ফুটে উঠতে হবে। আমরা চাই, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা পালন করুক, যাতে জনগণ নিশ্চিন্ত থাকে।

তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং কমিশনের সুপারিশে এমন কিছু ইঙ্গিত রয়েছে, যা নিরপেক্ষতার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সালাহউদ্দিন আহমদের মতে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা ও সংলাপের পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু এখন যে দলিল প্রকাশিত হয়েছে, তা ঐকমত্য নয়, বরং চাপিয়ে দেওয়া মতামতের প্রতিফলন।

তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্যের নামে জাতিকে বিভক্ত করার মতো কোনো প্রচেষ্টা জাতির জন্য শুভ নয়। ঐকমত্যের উদ্দেশ্য যদি হারিয়ে যায়, তবে কমিশনের অস্তিত্বেরই যৌক্তিকতা থাকে না।

তিনি আরও জানান, কমিশনের প্রকাশিত রিপোর্টে সংবিধান সংশোধনের জন্য ৪৮টি প্রস্তাব তফসিল আকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, এসব বিষয়ে গণভোট হবে। কিন্তু বিএনপি বা তাদের সঙ্গে জোটভুক্ত দলগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সালাহউদ্দিন প্রশ্ন করেন, গণভোটের আগে যদি জনগণের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া না হয়, তাহলে এটি কেমন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া?

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল।
এছাড়া বক্তব্য দেন, সাবেক বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহাদী আমিন।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জাপান, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, ডেনমার্ক, কোরিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনৈতিক প্রতিনিধি দল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সালাহউদ্দিন আহমদের এই বক্তব্য মূলত কমিশনের সুপারিশকে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের ইঙ্গিত হিসেবে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা। 

তাদের মতে, বিএনপি এখন কমিশনের সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরকারকে চাপের মুখে ফেলতে চাইছে।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, কমিশনের প্রস্তাবগুলো এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে, এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সব দলকেই মতামত জানানোর সুযোগ দেওয়া হবে।

গোলটেবিল বৈঠকের শেষ পর্যায়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা ঐক্য চাই, কিন্তু সেই ঐক্য হতে হবে সমতার ভিত্তিতে। কমিশন যদি সরকার ও কিছু দলের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে জাতীয় ঐক্যের স্বপ্ন ভেঙে যাবে। জনগণ তা মেনে নেবে না।’

বৈঠক শেষে বিএনপির নেতারা জানান, কমিশনের সুপারিশ নিয়ে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন এবং প্রয়োজনে জাতীয় সংলাপ আহ্বানের দাবি তুলবেন।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের পর বিএনপি একে একপক্ষীয় ও অসংগতিপূর্ণ বলে আখ্যা দিয়েছে। 

সালাহউদ্দিন আহমদের ভাষায়, রেফারি এখন খেলোয়াড়ের ভূমিকায়। কমিশনের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হওয়ায় নতুন রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে তার এই বক্তব্য।

ইএইচ