সালাহউদ্দিন আহমদ

একটি দল ইসলামকে ঢাল বানিয়ে বিভক্তির রাজনীতি করছে

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: নভেম্বর ১, ২০২৫, ০৭:১৩ পিএম

দেশের একটি রাজনৈতিক দল ইসলাম ধর্মের পবিত্র আবেগকে ব্যবহার করে বিভক্তি ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, নির্বাচন সামনে এলে তাদের থেকে মুসলমানদের সাবধান থাকতে হবে।

শনিবার নারায়ণগঞ্জ শহরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে কাসেমী পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত ‘আজমতে সাহাবা’ শীর্ষক মহাসম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিভিন্ন মাদরাসার শিক্ষক, ইসলামপন্থী সংগঠনের প্রতিনিধি ও বিএনপির ধর্মীয় বিষয়ক উপকমিটির নেতারা।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমরা মদিনার ইসলাম বিশ্বাস করি যে ইসলাম মহানবী (সা.) প্রবর্তন করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরাম তা পালন করেছেন। সেই ইসলাম মানবতার, ভ্রাতৃত্বের এবং ন্যায়ের বার্তা দেয়। কিন্তু আজ কিছু গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দার জন্য ভিন্ন মতের ইসলাম তৈরি করছে, যা সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি করছে।”

তিনি বলেন, কেউ মওদুদীর ইসলামে বিশ্বাসী, কেউ আবার ধর্মের নামে সংঘাত সৃষ্টি করছে। অথচ ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হলো ঐক্য ও সহনশীলতা। কিন্তু একটি দল সেই ধর্মকেই ব্যবহার করছে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে।

বিএনপির এই নেতা মনে করেন, ইসলামকে ব্যবহার করে রাজনীতি করা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেটি আরও বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে।

তিনি বলেন, যখনই নির্বাচন আসে, তখনই কিছু শক্তি ইসলামকে সামনে এনে জনগণের আবেগকে ব্যবহার করে। একসময় ধর্মীয় স্লোগানে ভোট চাওয়া হয়েছে, এখন আবার বিভক্তি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে কে ‘সঠিক মুসলমান’, কে ‘ভ্রান্তপথে’এমন লেবেল লাগানো হচ্ছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বিভাজন কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, এটি বিশ্বাস ও সমাজকেও বিভক্ত করছে। মুসলমানদের মধ্যে সন্দেহ ও শত্রুতা তৈরি করে ইসলামবিরোধী শক্তিগুলো লাভবান হয়।

বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের ধর্মনীতির সমালোচনা করে বলেন, শেখ হাসিনার সরকার ইসলামবিদ্বেষী ছিল। তারা ইসলামী শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইসলামী চেতনা দমিয়ে রাখতে চেয়েছে। আলেম-ওলামাদের প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ করেছে।

তিনি আরও বলেন, তাদের অপরাজনীতি ছিল মুসলিম সমাজের বিভাজন ঘটানো। আলেমদের গ্রেপ্তার, ইসলামি বক্তাদের নিষিদ্ধ করা, মসজিদ ও মাদরাসাকে সন্দেহের চোখে দেখা সবই ছিল পরিকল্পিত ইসলামবিরোধী নীতি।

সালাহউদ্দিন আহমদের দাবি, সেই রাজনীতির পরিণতিই আজ আওয়ামী লীগের পতনে প্রতিফলিত হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী যে দল ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, জনগণ শেষ পর্যন্ত তাদের প্রত্যাখ্যান করে। ইসলামকে আঘাত করে কেউ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

বিএনপির এই স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, আমরা ইসলামকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নয়, বরং ন্যায়, সমতা ও সুশাসনের মূলনীতি হিসেবে দেখি। ইসলাম আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, বরং সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তিনি আরও যোগ করেন, আমরা চাই এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে মুসলমানেরা তাদের ধর্ম পালনে স্বাধীনতা পাবে, অমুসলিমরাও সমান অধিকার ভোগ করবে। ইসলাম মানে সহনশীলতা, সংহতি ও সামাজিক ন্যায়বিচার। বিএনপি সেই আদর্শেই বিশ্বাসী।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আজকাল ধর্মের নামে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে কিছু গোষ্ঠী রাজনীতি করছে। কেউ বলছে, তাদের পথই একমাত্র সঠিক, অন্যরা সবাই ভুল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) তো বলেননি তোমরা নিজেদের গোষ্ঠীকে শ্রেষ্ঠ ভাবো। বরং তিনি ঐক্যের ডাক দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, যারা ইসলামকে দলীয় প্রচারণার উপকরণ বানায়, তারা ইসলামকে নয় নিজেদের স্বার্থকেই পরিবেশন করে। ধর্মের নামে সহিংসতা বা বিভাজন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকেও ইঙ্গিত করেন।

তিনি বলেন, রাজনীতির নামে এখন এক ধরনের ফিতনা চলছে কেউ ধর্মের ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষের মনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, কেউ ইসলামী স্লোগান তুলে নিজেদের স্বার্থে মানুষকে ব্যবহার করছে। এভাবে চললে সমাজে শান্তি ফিরবে না।

তার ভাষায়, ইসলামের নামে যে বিভাজন সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা ইসলামের পরিপন্থী। ইসলাম মানুষকে এক করে, বিভক্ত করে না।

আজমতে সাহাবা মহাসম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন, বিএনপির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মাওলানা হাবিবুর রহমান, সাবেক এমপি নূরুল ইসলাম খান ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মুফতি ফরিদুল ইসলাম।

তারা বলেন, ইসলামের নামে রাজনীতিক বিভক্তি সৃষ্টিকারীরা আসলে ইসলামের শত্রু। ইসলামের মূল আদর্শ হলো ঐক্য, দয়া ও ভ্রাতৃত্ব।

মুফতি ফরিদুল ইসলাম বলেন, আজ যে দল ইসলামকে ব্যবহার করছে, তারা ইসলামের মূল চেতনা বোঝে না। সাহাবায়ে কেরামের উদাহরণই যথেষ্ট তারা কখনো দলীয় স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করেননি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা ইসলামী চিন্তা ও চেতনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু ধর্মের নামে ভোটের ব্যবসা করব না। ইসলাম কারও একার সম্পত্তি নয় এটি সমগ্র মানবতার মুক্তির বার্তা।

সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য মূলত একটি আহ্বান রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধের। তিনি মনে করেন, ইসলাম কেবল আচার নয়, একটি নৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা।

তার ভাষায়, যদি কেউ ইসলামকে ব্যবহার করে বিভক্তি তৈরি করে, তাহলে সেটি ইসলাম নয়, সেটি ফিতনা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য ধর্ম ও রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষার এক নতুন বার্তা বহন করছে।

ইএইচ